ব্রেজিলের কালো বাঘ ও বীরভূমের খটাশ রহস্য
স্যার আর্থার কনান ডায়েলের ব্রেজিলিয়ান ব্ল্যক ক্যাট গল্পটির বঙ্গায়ন, 'ব্রেজিলের কালো বাঘ'টা সবে আধা শেষ করেছি। ইতিমধ্যেই ক্লাইম্যাক্সের চূড়ান্ত জায়গায় পৌঁছে গেছে।
এভারার্ডের পাতা ফাঁদে পা দিয়ে এই বাঘের খাঁচার ছাউনি খামচে ধরে মার্শাল নিজেকে খানিকটা নিরাপদ জায়গায় নিয়ে গেলেও, সে এখন মুখ হাঁ করা কালো বাঘের ভয়ঙ্কর চোখের নজরে।
এমন সময় মোবাইল বেজে উঠল। আমার মামাতো ভাই, পুলক বীরভূমের এক অজগাঁ থেকে ফোন করেছে। কৃষিবিদ্যায় ডিগ্রি নিয়ে সে এখন নিজের পৈতৃক বাড়িঘর ছেড়ে বীরভুম কয়েক বিঘে জমি কিনে 'ফার্ম হাউস' বানিয়েছে। উদ্দেশ্য গ্রামের মানুষদের হাতে কলমে কৃষিশিল্প করে দেখানো।
অনেক কথার পর সে আমায় তাঁর খামার বাড়িতে দু'দিন ছুটি কাটানোর অনুরোধ জানায়। পুলকের কথায় যাতে রাজি হই তারজন্য অবিশ্যি একটা টোপ ছিল। আমায় বাঘ দেখেবে! আমি অবিশ্যি রাজি হয়েছি তবে পুলকের বাঘের টোপে নয়।
গভীর রাতে কালো বাঘের গল্পে আমারও যেন কেমন ভয় লাগছিল। গল্পের ছ'পাতা বাকি অথচ এক লাইনও আর এগুতে পারলুম না।
১. পুলকের খামার অভিজ্ঞতা
২১ শে নভেম্বর, ২০২২। বিশ্বভারতী ফাস্ট প্যাসেঞ্জারে বোলপুর স্টেশনে যখন নেমেছি, ঘড়ির কাটায় তখন রাত্রি আটটা দশ। পুলক স্টেশনে এসেছে। স্টেশন থেকে পুলকের পুরানো মটর সাইকেলে ওঁর খামার বাড়ি পোঁছাতে প্রায় সোয়া ঘন্টা সময় লেগেছে। পুলকের রাঁধুনি কাম সর্বক্ষণের কর্মচারী, ইদ্রিস সন্ধ্যেবেলাই রান্না করেই রেখেছিল।
টিউবওয়েলে হাতমুখ ধুয়ে আগেই খেয়ে নিলুম। পোষ্টর বড়া, ডাল, পাঁচমেশালি তরকারি আর চারাপোনার ঝোল - মনেহল যেন অমৃত। কোলকাতার আকাশে আলোর দূষণ। বীরভূমের এই প্রত্যন্ত গ্রামে ঝকঝকে হেমন্তের আকাশ। কৃষ্ণপক্ষের রাত্রি, চাঁদ নেই।
উত্তর-পূবের আকাশে ভেনাস, দক্ষিণ-পশ্চিমের আকাশে বৃহস্পতি আর তার নিচে হরাইজনের উপর সামান্য পশ্চিম ঘেঁসে অস্পষ্ট শনি। রাতে তাড়াতাড়িই ঘুমিয়েছি। স্বপ্নে দেখলুম পুলকের পোলট্রি খাঁচায় একটা বাঘ থাবা ভরেছে।
২. পুকুর ও জমি পরিদর্শন
২২ শে নভেম্বর, ২০২২। পুলকের বাড়িটি পাকা রাস্তা ছেড়ে অজয়ের দিকে আরও পাঁচ মিনিট গেলে কাঁচা রাস্তার ডান দিকে। দু'বিঘা জমির ওয়ান-ফোর্থ পুকুর। মাছ চাষ হয়। রাস্তার উপর টিনের ছাউনি আর ইটের গাঁথুনি দেওয়া তিন কামরার খামার বাড়ি।
বাড়ির সামনে বড় উঠোন। উঠোনের দক্ষিণ ও পশ্চিমে এল-আকৃতির মুরগী খামার। পশ্চিমের অংশটার পেছনে চার কাঠা জমিতে শীতের শব্জি বাগান। বাগানের পশ্চিম প্রান্তে পুকুর। পুকুরের পেছনে জলা জায়গা আর উঁচু ঘাসের বন।
বিকেলে ঘাসের জঙ্গলের দিকটা ঘুরে এসেছি। অনেক পাখি। জলা জায়গায় অনেক ডাহুক পাখির ডাক শুনলাম। পুকুরের দক্ষিণে বড় বড় অর্জুন আর সোনাঝুড়ি গাছে অনেক পাখির বাসা। ঘাসবন ছাড়িয়ে আরও পশ্চিমে ঘন জঙ্গল। শেয়াল থাকা অসম্ভব নয়। দুটি গোসাপ দেখেছি।
৩. রাতের বাঘ অভিজ্ঞতা
রাতে কাছারি ঘরেই খাওয়ার ব্যবস্থা হল। বাগানের বেগুন পোড়া, ডিমের ঝোল ভাত। খাওয়া শেষে অনেক রাত্তির অব্দি জেগে রইলুম। বহুদূর থেকে শব্দ ভেসে আসছিল। ইদ্রিশ বলল, শেয়ালের ডাক।
৪. শেষ দিনের অভিজ্ঞতা
২৪ শে নভেম্বর, ২০২২। দুপুরে শান্তিনিকেতন এক্সপ্রেসে ফিরছি। গতরাতের স্বপ্নের কথা যেমন কিছুতেই ভুলতে পারছিনা আবার সেই মুরগী চোরের মুখের সাথে যে কার মিল আছে তাঁর কথাও মনে করতে পারছিনা।
No comments:
Post a Comment