30 Dec 2025

পশ্চিমবঙ্গ রুফটপ সোলার: নতুন নির্দেশিকা Procedure C–2025

পশ্চিমবঙ্গ বিদ্যুৎ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (WBERC) এই রাজ্যে রুফটপ সোলার সিস্টেম বসানো বিদ্যুৎ -গ্রিডের সাথে সংযোগ করার বিষয়ে ওয়েস্টবেঙ্গল ইলিকট্রিসিটি ডিস্ত্রিবিউশন কোম্পানির (WBSEDCL) নিয়মাবলী বা Procedure C–2025 অনুমোদন করেছে। আপনি যদি বাড়ির ছাদে বা কারখানার শেডে রুফটপ সোলার সিস্টেম বসাতে চান, তাহলে আপনাদের জন্য এই নিয়মাবলী প্রযোজ্য হবে।

১. কারা রুফটপ সোলার সিস্টেম বসাতে পারবেন?

WBSEDCL-এর যেকোনো গ্রাহক (আবাসিক, বাণিজ্যিক বা শিল্প) যাদের অনুমোদিত লোড (Sanctioned Load) অন্তত ১ কিলোওয়াট, তারা রুফটপ সোলার সিস্টেম বসাতে পারবেন। রুফটপ সোলার সিস্টেমের সর্বনিম্ন ক্ষমতাও হতে হবে ১ কিলোওয়াট (kWp)

২. মিটারিং-এর জন্য তিন ধরনের বন্দোবস্ত (যেকোনো একটি বেছে নিতে হবে)

নতুন নিয়মে গ্রাহক তিনটি উপায়ে বিদ্যুৎ আদান-প্রদান করতে পারেন:

  • নেট-মিটারিং (Net-Metering): রুফটপ সোলার সিস্টেমের ক্ষমতা সর্বোচ্চ ৫০০ কিলোওয়াট পর্যন্ত। উৎপাদিত বাড়তি বিদ্যুৎ গ্রিডে যাবে, আবার প্রয়োজন হলে গ্রিড থেকে নেওয়া যাবে। মাস শেষে শুধু 'নেট' বিদ্যুৎ ব্যবহারের বিল দিতে হবে।
  • নেট-বিলিং (Net-Billing): বিদ্যুতের ব্যবহার ও উৎপাদন আলাদাভাবে মাপা হয়। আপনি গ্রিড থেকে যা নেবেন তা আপনার জন্য প্রযোজ্য রেটে বিল হবে, আর গ্রিডে যা দেবেন তার জন্য কমিশন নির্ধারিত দাম (Feed-in Tariff) পাবেন।
  • গ্রস-মিটারিং (Gross-Metering): রুফটপ সোলার সিস্টেমের পুরো বিদ্যুৎই গ্রিডে বিক্রি করে দেওয়া হয়। নিজের ব্যবহারের জন্য আলাদাভাবে গ্রিড থেকে বিদ্যুৎ কিনতে হয়।

পশ্চিমবঙ্গ বিদ্যুৎ নিয়ন্ত্রণ কমিশন ইতিমধ্যে রাজ্যের প্রতিটি বিদ্যুৎ সরবরাহকারী সংস্থার জন্য সৌর বিদ্যুতের ফিড-ইন-ট্যারিফ নির্ধারণ করেছে।

৩. আবেদনের ধাপ ও সময়সীমা

পুরো প্রক্রিয়াটি এখন অনেক বেশি স্বচ্ছ এবং দ্রুত করা হয়েছে:

  • অনলাইন আবেদন: নির্ধারিত পোর্টালের মাধ্যমে আবেদন করতে হবে।
  • সমীক্ষা (Feasibility Study): আবেদনের ১৫-২০ দিনের মধ্যে WBSEDCL জানাবে আপনার এলাকার গ্রিডে (ডিস্ট্রিবিউশন ট্রান্সফরমার) সৌর বিদ্যুৎ নেওয়ার সক্ষমতা আছে কি না।
  • ইনস্টলেশন: অনুমোদনের ১৮০ দিনের মধ্যে (প্রয়োজনে আরও ৯০ দিন বাড়ানো যায়) সোলার সিস্টেম বসাতে হবে।
  • সংযোগ: রুফটপ সোলার সিস্টেম বসানোর ১৫ দিনের মধ্যে WBSEDCL মিটার বসিয়ে গ্রিড সংযোগ বা কমিশনিং সম্পন্ন করবে।

৪. নতুন নির্দেশিকার ৫টি বিশেষ সুবিধা ও শর্ত

  • চুক্তি ও রেট: একবার যে দরে (Tariff) বিদ্যুৎ বিক্রির চুক্তি হবে, রুফটপ সোলার সিস্টেমের পুরো জীবনকাল (সাধারণত ২৫ বছর) সেই রেটই বজায় থাকবে।
  • সরকারি প্রকল্পে ছাড়: সরকারের আর্থিক সহায়তায় সোলার বসলে গ্রাহকের লোড বা ডিমান্ডের চেয়েও বেশি ক্ষমতার রুফটপ সোলার সিস্টেম বসানো সম্ভব। সেক্ষেত্রে আবেদন ফি লাগবে না।
  • সুইচওভার সুবিধা: গ্রাহক চাইলে এক মিটারিং ব্যবস্থা (যেমন নেট-বিলিং) থেকে অন্য মিটারিং ব্যবস্থায় পরিবর্তন করার সুবিধা থাকছে।
  • ফিটনেস সার্টিফিকেট: রুফটপ সোলার সিস্টেম নিরাপদ কি না তা যাচাই করতে হবে। ১৭০ কিলোওয়াট পর্যন্ত ক্ষমতার জন্য প্রতি ৩ বছর অন্তর এবং তার বেশি হলে প্রতি ২ বছর অন্তর ফিটনেস সার্টিফিকেট রিনিউয়াল করতে হবে।
  • সুরক্ষা: রুফটপ সোলার সিস্টেমের ইনভার্টার ও আর্থিংয়ের জন্য নির্ধারিত মান বজায় রাখা বাধ্যতামূলক যাতে গ্রিডে কোনো বিপদ না ঘটে।

৫. আবেদনের সাথে প্রয়োজনীয় নথিপত্র

আবেদন করার সময় গ্রাহককে এই নথিগুলো তৈরি রাখতে হবে:

  • সর্বশেষ বিদ্যুৎ বিলের কপি।
  • জমির বা ছাদের মালিকানা সংক্রান্ত নথি (Land/Roof ownership documents) অথবা এনওসি (NOC)।
  • সোলার প্যানেল ও ইনভার্টারের টেকনিক্যাল স্পেসিফিকেশন।
  • গ্রাহকের আধার বা ভোটার কার্ডের কপি।

৬. সক্ষমতার সীমাবদ্ধতা (Capacity Limit)

বিদ্যুৎ সংযোগকারী ডিস্ট্রিবিউশন ট্রান্সফর্মারের ওপর কতটা চাপ পড়বে তার একটি নিয়ম করা হয়েছে:

  • আপনার এলাকার স্থানীয় ডিস্ট্রিবিউশন ট্রান্সফর্মারের (DT) মোট ক্ষমতার ১০০% পর্যন্ত সোলার সংযোগ দেওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। আগে এটি কম ছিল, এখন ট্রান্সফরমারের ফুল ক্যাপাসিটি ব্যবহার করা যাবে।

৭. ইনভার্টার ও গ্রিড সুরক্ষা (Anti-Islanding)

এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ টেকনিক্যাল পয়েন্ট: সোলার সিস্টেমে 'অ্যান্টি-আইল্যান্ডিং' (Anti-Islanding) সুরক্ষা থাকা বাধ্যতামূলক। এর মানে হলো, যদি গ্রিড বা মেইন লাইনে কারেন্ট চলে যায়, তবে রুফটপ সোলার সিস্টেমও স্বয়ংক্রিয়ভাবে বিদ্যুৎ পাঠানো বন্ধ করে দেবে। এটি লাইনম্যানদের কাজ করার সময় বিদ্যুতায়িত হওয়ার সম্ভবনা থেকে রক্ষা করে।

৮. ভার্চুয়াল নেট মিটারিং (Virtual Net Metering - VNM)

নতুন অর্ডারে কিছু বিশেষ ক্ষেত্রে (যেমন সরকারি আবাসন বা কমিউনিটি হাউজিং) ভার্চুয়াল নেট মিটারিংয়ের সুযোগ থাকতে পারে, যেখানে এক জায়গায় উৎপাদিত সৌর বিদ্যুৎ অন্য মিটার থেকে অ্যাডজাস্ট করা যায়। তবে এটি সাধারণ আবাসিক গ্রাহকের চেয়ে গ্রুপ বা প্রতিষ্ঠানের জন্য বেশি প্রযোজ্য।

৯. বিলিং সাইকেল ও সেটেলমেন্ট (Settlement Period)

  • বিদ্যুতের হিসাব সাধারণত এপ্রিল থেকে মার্চ (আর্থিক বছর) অনুযায়ী করা হয়।
  • বছরের শেষে যদি গ্রাহকের জমা বিদ্যুৎ (Credit Units) থেকে উদ্বৃত্ত থাকে, তাহলে সেই অতিরিক্ত ইউনিটের মূল্য কমিশন নির্ধারিত হারে গ্রাহককে প্রদান করা হবে।

১০. সিস্টেম আপগ্রেডেশনের খরচ

যদি বর্তমান মিটার মিটার বা সার্ভিস লাইন রুফটপ সোলার সিস্টেমের জন্য উপযুক্ত না হয়, তবে সেই পরিবর্তনের প্রাথমিক খরচ (যেমন মিটার টেস্টিং চার্জ বা সার্ভিস লাইন পরিবর্তন) গ্রাহককেই বহন করতে হবে।

১১. দায় দায়িত্ব

  • গ্রাহক: রুফটপ সোলার সিস্টেম থেকে মিটারের আগে পর্যন্ত সমস্ত বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতির রক্ষণাবেক্ষণ এবং সুরক্ষা নিশ্চিত করা।
  • WBSEDCL: মিটার-পরবর্তী গ্রিডের রক্ষণাবেক্ষণ, সঠিক বিলিং এবং সময়মতো পাওনা নিষ্পত্তি করা।

শেষ কথা

Procedure C–2025 চালু হওয়ার ফলে এখন রুফটপ সোলার সিস্টেম বসানো অনেক বেশি সহজ ও সরল হল। এটি কেবল বিদ্যুৎ-এর বিল কমাবে না, বরং রাজ্যের পুনর্নবীকরণযোগ্য শক্তি উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা পূরণে সাহায্য করবে।

প্রাসঙ্গিক তথ্য: এই নতুন পদ্ধতি কার্যকর করতে WBSEDCL-কে এক মাস সময় দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ ২০২৬-এর শুরু থেকেই এই সব সুবিধা কার্যকরী হবে।

পড়ুন: সোলার সেলের দক্ষতা: বর্তমান প্রযুক্তি ও ভবিষ্যতের পথে নতুন মাইলফলক

3 comments:

Featured post

২০২৫ সালে ভারতের পুনর্নবীকরণযোগ্য শক্তি: সৌর ও বায়ুশক্তিতে রেকর্ড উৎপাদন

২০২৫ সালে ভারতের রিনিউএবল এনার্জি সেক্টর আর শুধু “অলটারনেটিভ” নয়; এখন সেটা দেশের পাওয়ার সাপ্লাই সিস্টেম-এর অন্যতম অংশীদার। সোলার, উইন্ড, ব...

পপুলার পোস্ট