Showing posts with label Unmindful Tales. Show all posts
Showing posts with label Unmindful Tales. Show all posts

23 Jan 2026

জাতীয়তাবাদ, ফ্যাসিবাদ ও নেতাজি: ইতিহাসের নিরিখে মূল্যায়ন

১. উগ্র জাতীয়তাবাদ ও ফ্যাসিবাদের উত্থান

উনিশ শতকের শেষভাগ ও বিশ শতকের গোড়ায় ইউরোপে জাতীয় রাষ্ট্রের উত্থানের সঙ্গে সঙ্গে এক বিশেষ ধরনের রাজনৈতিক মতাদর্শ গড়ে ওঠে যার নাম উগ্র জাতীয়তাবাদ। এই জাতীয়তাবাদ পুঁজিবাদী সম্প্রসারণের স্বার্থে ক্রমশ সাম্রাজ্যবাদী ও বর্ণবাদী রূপ নেয়। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর অর্থনৈতিক বিপর্যয়, বেকারত্ব ও রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যে এই উগ্র জাতীয়তাবাদ থেকেই ফ্যাসিবাদের জন্ম হয়। ইতালিতে মুসোলিনি এবং জার্মানিতে হিটলার তার ভয়াবহ উদাহরণ। জার্মানির ন্যাশনাল সোশ্যালিস্ট জার্মান ওয়ার্কার্স পার্টি বা এনএসডিএপি নামের মধ্যে সোশ্যালিজম থাকলেও বাস্তবে তা সমাজতন্ত্রের সম্পূর্ণ বিপরীত একটি চরম জাত্যাভিমানী, বর্ণবাদী ও সামরিকতান্ত্রিক দমনমূলক মতাদর্শ। এই তথাকথিত ন্যাশনাল সোশ্যালিজম ছিল কালো রঙের সাদা বেড়ালের মতো — নামে সমাজতন্ত্র হলেও কাজে ছিল ফ্যাসিবাদ।

4 Jan 2026

মার্কিন আগ্রাসন ও ভেনিজুয়েলা: পুঁজিবাদের সংকটের রাজনৈতিক রূপরেখা

সাম্রাজ্যবাদ, পুঁজিবাদের সংকট ও ভেনিজুয়েলা: কেন এই আগ্রাসন বিচ্ছিন্ন নয়

ভূমিকা

সাম্রাজ্যবাদ হলো একটি শক্তিশালী দেশ বা জাতির অন্য দুর্বল দেশ বা অঞ্চলের উপর রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক আধিপত্য বিস্তারের নীতি। এই আধিপত্য বিস্তারের কাজটি করা হয় অর্থনৈতিক, কূটনৈতিক বা সামরিক প্রভাব খাটিয়ে। সাম্রাজ্যবাদের মূল লক্ষ্যই সম্পদ ও বাজারের দখল বা নিয়ন্ত্রণ এবং নিজেকে আরও শক্তিশালী করে তোলা। ভেনিজুয়েলায় মার্কিন আগ্রাসন তার সর্বশেষ উদাহরণ মাত্র।

সাম্রাজ্যবাদ কী এবং কেন এটি পুঁজিবাদের চূড়ান্ত রূপ

সাম্রাজ্যবাদ বলতে বোঝায় একটি শক্তিশালী রাষ্ট্রের দ্বারা অন্য দুর্বল রাষ্ট্রের উপর রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক আধিপত্য প্রতিষ্ঠার প্রক্রিয়া। সাম্রাজ্যবাদ যেভাবে কাজ করে:

  • অর্থনৈতিক চাপ ও ঋণের ফাঁদ
  • কূটনৈতিক হস্তক্ষেপ
  • প্রয়োজনে সরাসরি সামরিক আগ্রাসন

লেনিনের বিশ্লেষণে স্পষ্ট যে, সাম্রাজ্যবাদ হলো পুঁজিবাদের সর্বোচ্চ ও সংকটপূর্ণ স্তর। মুনাফার স্বাভাবিক পথ সংকুচিত হলে দখল ও লুটই হয়ে ওঠে শেষ ভরসা।

ভেনিজুয়েলায় মার্কিন সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসন ও পুঁজিবাদের সংকট নিয়ে রাজনৈতিক বিশ্লেষণ

সভ্যতার ভাষা, ভেতরে দখলদারির রাজনীতি

সাম্রাজ্যবাদ নিজেকে মানবাধিকার, গণতন্ত্র ও সভ্যতার রক্ষকর্তা হিসেবে তুলে ধরে। কিন্তু এই ভাষার আড়ালে থাকে সম্পদ দখল ও ভূ-রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণের নীতি। ভেনিজুয়েলায় “অস্ত্র”, “মাদক” বা “গণতন্ত্র রক্ষা” আসলে রাজনৈতিক আড়াল। দেশটি খনিজ ও জ্বালানি সম্পদে সমৃদ্ধ এবং স্বাধীন অর্থনৈতিক নীতি অনুসরণ করছে, যা সাম্রাজ্যবাদের জন্য অগ্রহণযোগ্য।

আমেরিকার সংকট: এটি কেবল ঋণের হিসাব নয়

  • যুক্তরাষ্ট্র ইতিহাসের সর্বোচ্চ ঋণের বোঝা বহন করছে।
  • গড়ে প্রতিটি নাগরিকের মাথাপিছু ঋণ ১ লক্ষ ২৫ হাজার ডলারের বেশি।
  • মোট ঋণ ভারতের প্রায় ৬–৭ বছরের বাজেটের সমান।
  • সুদের বোঝা রাষ্ট্রীয় সংকটে পরিণত হয়েছে।

একমেরু বিশ্বের অবসান ও বহুমেরু বাস্তবতা

সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যাওয়ার পর বিশ্ব দীর্ঘদিন একমেরু ছিল। আজ সেই বাস্তবতা বদলেছে। বর্তমান বৈশ্বিক পরিবর্তনগুলো হলো:

  • চীনের প্রযুক্তি ও শিল্পে উত্থান।
  • বিশ্ববাজারে একচেটিয়া আধিপত্যের অবসান।
  • ট্যারিফ যুদ্ধের মাধ্যমে মার্কিন বাজার রক্ষার চেষ্টা।

ডলারের একাধিপত্যে ফাটল

ডলার দীর্ঘদিন বৈশ্বিক অর্থনীতির কেন্দ্রবিন্দু ছিল। কিন্তু চীন, রাশিয়া, ভারত, ব্রাজিল ও দক্ষিণ আফ্রিকা বিকল্প পেমেন্ট ব্যবস্থা ও নিজস্ব মুদ্রায় বাণিজ্যের পথে এগোচ্ছে। এই পরিবর্তন সাম্রাজ্যবাদী ব্যবস্থার জন্য গভীর উদ্বেগের কারণ।

ভেনিজুয়েলা একা নয়

ভেনিজুয়েলা, ইরাক, লিবিয়া, ইরানে আমেরিকার সামরিক আগ্রাসন কোনো বিচ্ছিন্ন যুদ্ধ নয়। এগুলো হলো আমেরিকার নিজস্ব পুঁজিবাদী সংকট ঢাকার ধারাবাহিক সাম্রাজ্যবাদী পদক্ষেপ

বামপন্থী অবস্থান ও আন্তর্জাতিক সংহতি

বামপন্থীরা ঐতিহাসিকভাবেই সাম্রাজ্যবাদের বিরোধী। এই ধারাবাহিকতায় ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্ক্সবাদী) ভেনিজুয়েলায় মার্কিন আগ্রাসনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ মিছিল করেছে।

উপসংহার

সাম্রাজ্যবাদ যতই ভাষা ও মুখোশ বদলাক, তার মৌলিক চরিত্র বদলায় না। ভেনিজুয়েলা সেই বৃহত্তর পুঁজিবাদী সংকটেরই প্রকাশ।

ডিসক্লেইমার: এই লেখা লেখকের ব্যক্তিগত রাজনৈতিক বিশ্লেষণ ও মতামতের উপর ভিত্তি করে। এর উদ্দেশ্য কোনো ঘৃণা বা সহিংসতা উসকে দেওয়া নয়।

পড়ুন: ২০২৬-এর নতুন সকাল: উৎসবের আলো আর লড়াইয়ের অন্ধকার

3 Jan 2026

পোস্তদানা ও কলম্বাসের চালবাজি: চাঁদের রহস্য

ভূমিকা

কবিরা চাঁদকে নিয়ে কবিতা লেখেন, সাহিত্যিকরা লেখেন গল্প। হার্ডকোর বস্তুবাদীদের কাছে সেটি নেহাতই একটা 'সেলিস্টিয়াল বডি', পৃথিবীর নিকটতম প্রতিবেশী এবং একমাত্র উপগ্রহ। চাঁদ বিষয়ে আমাদের অপার কৌতূহল। এখন মুন এক্সপ্লোরাররা চাঁদের মাটিতে 'হিলিয়াম ৩' বা ট্রিটিয়াম খুঁজছে। গোটা পৃথিবীতে নাকি এই অমূল্য জ্বালানি মাত্র ৮০ কেজির মতো আছে।

নিউটাউনের বাঁশবাগানে পূর্ণিমার চাঁদের আলোয় আকাশ
চিত্রঃ নিউটাউনে বাঁশবাগানে চাঁদের আলো

খেলার মাঠের স্কেলে সৌরজগৎ

একটি বিশাল ফুটবল মাঠকে মাপার স্কেল মনে করা যাক। এই মাঠের এক প্রান্তে রাখা একটি গরুর গাড়ির চাকা সূর্য হলে, অন্য প্রান্তে রাখা একটি ছোট্ট মটরশুঁটির দানা হবে এই পৃথিবী। এই স্কেলে সূর্য থেকে পৃথিবীর দূরত্ব মাত্র ৮৫ মিটার হলেও, নিকটতম নক্ষত্র প্রক্সিমা সেন্টোরি থাকবে প্রায় ২৩,০০০ কিলোমিটার দূরে।

নাসরিনের গল্প ও চাঁদের নজরদারি

ছোটবেলায় নাসরিন তার মাকে জিজ্ঞাসা করেছিল, "চাঁদ কেন ঘুমায় না?" মা বলেছিলেন, "শিশুরা না ঘুমানো পর্যন্ত চাঁদ জেগে থাকে।" আজ নাসরিনের চুলে পাক ধরেছে। নাতির তাকে সে একই প্রশ্ন করে। তিনি উত্তর দেন, "দুষ্টুদের ওপর নজর রাখার জন্য চাঁদ জেগে থাকে।"

সাহিত্যের জ্যোৎস্না বনাম বাস্তব

নজরুল লিখেছেন, "চাঁদ হয়ে রব আকাশের ও গায়।" অন্যদিকে ক্ষুধার্ত সুকান্তর চোখে পূর্ণিমার চাঁদ ছিল 'ঝলসানো রুটি'। পুরাণে চাঁদের বয়স সাত লক্ষ কুড়ি বছর বলা হলেও বিজ্ঞানের হিসেবে তা প্রায় ৪৪২.৫ কোটি বছর।

কৌশলী কলম্বাস

১৫০৪ সালের ২৯শে ফেব্রুয়ারি। কলম্বাস জানতেন সেদিন পূর্ণগ্রাস চন্দ্রগ্রহণ হবে। তিনি স্থানীয় সর্দারকে ভয় দেখিয়ে বললেন, 'ঈশ্বর ক্রুদ্ধ হয়েছেন, আজ রাতে তিনি চাঁদকে গিলে ফেলবেন!' যখন গ্রহণ শুরু হলো, স্থানীয়রা ভয়ে খাবারে ভাণ্ডার খুলে দিল। এই কৌশলে কলম্বাস ও তাঁর সঙ্গীরা রক্ষা পেয়েছিল।

চাঁদের পাহাড়

আফ্রিকার সর্বোচ্চ পর্বত কিলিমাঞ্জারো তুষারাবৃত চূড়ার কারণে ইউরোপীয় এক্সপ্লোরারদের কাছে পরিচিত ছিল “The Mountain of the Moon” হিসেবে। কিলিমাঞ্জারো যেন রুক্ষ আফ্রিকার বুকে এক রহস্যময় চাঁদের পাহাড়।

ফিরে যাওয়া

১৯৭২ সালের পর মানুষ আর চাঁদে যায়নি। তবে নাসা তাদের আর্টেমিস কর্মসূচি অনুযায়ী ২০২৬ সালে নভোচারীদের আবার চাঁদের কক্ষপথে পাঠানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে। এই অভিযানে অংশ নেওয়া নভোচারীরা হবেন এই শতকের প্রথম মানুষ যারা এত কাছ থেকে চাঁদকে দেখবেন।

শেষকথা

চাঁদ বিজ্ঞানীর কাছে খনিজ ভাণ্ডার, কবির কাছে বিলাপের সুর, আর আমাদের মতো সাধারণ মানুষের কাছে এক অদ্ভুত বিস্ময়। চাঁদ আজও জেগে আছে, এবং সে জেগে থাকবে আরও কয়েক বিলিয়ন বছর।


আরও পড়ুন: উত্তর মেরুর বাড়ি ও বছরের শেষ পাটিসাপটা: ট্যাবলেটের সাথে এক সন্ধ্যা!

1 Jan 2026

২০২৬-এর নতুন সকাল: উৎসবের আলো আর লড়াইয়ের অন্ধকার

২০২৬-এর নতুন সকাল: উৎসবের আলো আর লড়াইয়ের অন্ধকার

নতুন বছরের সকাল। ঠান্ডা আছে। কুয়াশা থাকলেও রোদ্দুরকে আটকাতে পারেনি। উত্তরের হাওয়ার দাপট নেই। শিশিরে ভেজা গাছের পাতাগুলো এখনও শুকোয়নি। রাস্তায় ভিড়, বাজারের বেচাকেনা - সবই আর পাঁচটা দিনের মতো। দূর থেকে ভেসে আসে গান। গত রাতের নববর্ষ-বরণের রেশ এখনও কাটেনি। চায়ের দোকান ঠিক সময়েই খুলেছে।

চিত্রঃ ১লা জানুয়ারি ২০২৬: নিউটাউনের একটি সকাল

১. কৃত্রিম বুদ্ধি বনাম মানুষের পেট

অনেক কিছুই চোখে পড়ে না। মাথাপিছু দিনে দু’বেলা ২০০ গ্রাম চালের ভাত জোগাড় করতে যে খেটেখাওয়া মানুষ লড়ছে, তার মনের ভেতরের অবস্থার হিসাব কে রাখে? এ আই আছে, পিসি আছে। কৃত্রিম বুদ্ধি বলে, বিজনেস ডিস্ট্রিক্টের জায়গায় মন্দির হবে! সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে।

২. পুরোনো আতঙ্কের নতুন বছর

ফরিদাবাদে চলন্ত গাড়িতে বা রানাঘাটের হোমে পৈশাচিক ঘটনা; ঋণের দায়ে জলধর বাগের মত কৃষকদের ভয়ঙ্কর পরিণতি; আসামে রোস্টেড বিরোওয়া দম্পতি- নতুন বছরেও পুরোনো আতঙ্কই ফেরে।

৩. প্রতিরোধের সুর

মনে পড়ে Old Man River-এর গান; he just keeps rolling along… কিন্তু মনে হয়, ‘হি’ নয়; they just keep rolling, unitedly! শীতের মৃদু হাওয়ার সঙ্গে ভেসে আসে খবর, ধর্মঘটে গিগ কর্মীরা। চাপে পড়ে ঘোষণা হয় ‘বাড়তি ভাতা’।

৪. শৃঙ্খল ভাঙার ডাক

বিশাখাপত্তনম থেকে আসে শাশ্বত বার্তা, শ্রমজীবীদের ওপর আক্রমণ রুখতে তীব্র প্রতিরোধ গড়ে তুলতেই হবে। কমিউনিস্ট ইস্তেহারের সেই ঐতিহাসিক ঘোষণা - শ্রমিক শ্রেণীর শৃঙ্খল ছাড়া হারাবার কিছু নেই।

31 Dec 2025

উত্তর মেরুর বাড়ি ও বছরের শেষ পাটিসাপটা: ট্যাবলেটের সাথে এক সন্ধ্যা!

নতুন বছরের শেষ দিন

বছরের শেষ দিন। বাইরের তাপমাত্রা ১৫-১৬° সেন্টিগ্রেড, হালকা কুয়াশার চাদর। হাওয়া নেই। আকাশ পরিষ্কার থাকলেও গুটিকয়েক তারা আর মাথার উপর পশ্চিম ঘেঁসে আধা চাঁদ।

রাস্তায় স্ট্রিট লাইটের সাদা আলো। লাল-সবুজ বাতি গাড়ি নিয়ন্ত্রণ করছে। গাড়ির সংখ্যা এবং গতি অন্যদিনের মতোই। গাছের পাতা শিশিরে ভেজা। পাখিগুলি অন্য রাতের মতোই পাতার আড়ালে ঘুমিয়ে গেছে। ফুচকা, মোমোর দোকানে অতিরিক্ত কোনও ভিড় নেই।

Last sunset of the year 2025 captured from New Town, Kolkata, reflecting year-end emotions

ছবিঃ ২০২৫ সালের শেষ সূর্যাস্ত—নিউটাউনের আকাশজুড়ে বিদায়ের রঙ

(১)

চায়ের দোকানে পরিচিত মুখ। মাধবীলতা গাছের আড়ালে থাকা আলো আজও জ্বলেছে। দূরে ছাতিমগাছের ফুল থেকে গন্ধ ভেসে আসছে। রাস্তায় পড়ে আছে রুদ্র পলাশের পাপড়ি। কোথাও কোনও অস্বাভাবিকতা নেই। রাস্তার উল্টোদিকে ১২ তলা বাড়ির মাত্র চারটি ফ্ল্যাটে রোজকার মতো আজও আলো দেখা যাচ্ছে। মশারা বিরামহীন।

শীতের সন্ধ্যাটা বেশ জমে উঠেছে নলেন গুড়ের ঘ্রাণে। পাটিসাপটা পিঠের লোভ সামলানো দায়, তাই ফোনটা করলুম কাকা ওরফে আমার সেই ধুরন্ধর কাকাকেই। উদ্দেশ্য, ফেরার পথে যেন এক বাক্স নিয়ে আসে!

(২)

কিন্তু কাকা তো জাঁদরেল লোক! ফোন ধরতেই শর্ত জুড়ে দিল, “প্রশ্নের উত্তর ঠিক হলে যা চাইবি তাই নিয়ে যাব। বল তো দেখি, আমি একটা বাড়ি বানাতে চাই যার চারদিকই হবে দক্ষিণমুখী। সেই বাড়ি তৈরির অ্যাড্রেসটা কী হবে?”

ঘড়ি দেখলুম। ঠিক ২৩ সেকেন্ড সময় নিলুম। তারপর খুব শান্ত গলায় অ্যাড্রেসটা দিয়ে দিলুম। কাকা অবাক! কিন্তু কথা তো ফেরানো যায় না, তাই শেষমেশ এক বাক্স গরম পাটিসাপটা নিয়েই হাজির হলো সে।

(৩)

পিঠে খেতে খেতে ভাবলুম, বাজি যখন লড়তেই হবে তখন কাকার কেল্লাটাও একটু ফতে করি। বললুম, “কাকা, আমার প্রশ্নের উত্তর দিতে না পারলে কাল কিন্তু নলেন গুড়ের সন্দেশ মাস্ট!”

কাকার মুখে তখন সিকিভাগ পিঠে। অস্পষ্ট কিন্তু আত্মবিশ্বাসী গলায় উত্তর দিল, “কী প্রশ্ন শুনি?” আমি জিজ্ঞাসা করলুম, “ইংরেজি নববর্ষ ঠিক ক’টায় শুরু হবে?”

কাকা পিঠেটা চিবিয়ে গিলে নিয়ে বেশ আয়েশ করে বলল, “এ তো খুব সহজ, রাত বারোটার পর।” আমি হাসলুম। “না কাকা, ‘পরে-টরে’ নয়, ঠিক ক’টায় শুরু, সেটা বলতে হবে।”

(৪)

কাকা এবার একটু ধাঁধায় পড়ল। ওর অস্ফুট স্বরে শুনতে পেলুম— ‘বারোটা এক’, ‘বারোটা শূন্য দশমিক শূন্য এক’, ‘বারোটা শূন্য দশমিক শূন্য শূন্য শূন্য শূন্য এক’... কিন্তু সময়ের সেই পরম বিন্দু আর খুঁজে পেল না সে। শেষে হার মেনে বলল, “নাঃ হবে না কিন্তু হবে!” অবশ্য কাকা হার মানুক বা না মানুক, কালকের নলেন গুড়ের সন্দেশ কিন্তু আমার জন্য পাক্কা!

আপনাদের জন্য প্রশ্ন:

(১) আচ্ছা, বলুন তো সেই বাড়ির ঠিকানাটা কী ছিল যার চারপাশই দক্ষিণমুখী?
(২) আর নববর্ষ শুরু হওয়ার সেই 'পরম মুহূর্ত' কি সত্যিই ঘড়ির কাঁটায় ধরা যায়? যারা উত্তর জানেন না তারাই কমেন্ট করুন।

সাইকেলের চাকা আর রবি-স্মরণ: এক বৃষ্টির রাতের উপলব্ধি

একটি সাইকেলের চাকা এবং বৃষ্টির রাতে রাস্তার দৃশ্য যা জীবনের গতি ও দর্শনের প্রতীক

সাইকেলের প্যাডেল আর বৃষ্টির ছোঁয়া

সেদিন রাতে প্রায় ষোল কিলোমিটার সাইকেল চালিয়েছি। পুরানো সাইকেল কেনার প্রশ্নে বন্ধু মনোজ বলেছিল 'হেলথ্‌ ইনভেস্টমেন্ট'। পরে বুঝেছি, মেডিক্লেম কেনা আর সাইকেল কেনা উনিশ-বিশ।

রাতে সাইকেলের প্যাডেল ঘোরাতে ঘোরাতে হালকা বৃষ্টিতে ভিজছি আর ভাবছিলাম, বেঁচে থাকার জন্য কতই না কসরত! একটুখানি ‘বেশি’ দিন পাওয়ার জন্য কত দৌড়ঝাঁপ! কারখানার মজুরের মজুরি ঠিক হয় সেই ন্যূনতম মূল্যে, যা দিয়ে কোনো মতে বেঁচে থাকা যায়।

১. শেষের কবিতা ও দূরত্ব

মনে পড়ল সকালে বন্ধুর লেখা ২২ শে শ্রাবণে রবি ঠাকুর স্মরণে ‘শেষের কবিতা’র সেই অমর পংক্তি: "দূরত্ব যদি সত্যিই ভালোবাসার গভীরতা বাড়িয়ে দেয়, তবে আমি দূরেই থাকতে চাই। অনেক অনেক দূরে....."

২. সুন্দর ভুবনে বাঁচার আকাঙ্ক্ষা

বেঁচে থাকার প্রতি এক রবির গভীর আকাঙ্ক্ষায় শেষ করেছি—
"মরিতে চাহি না আমি সুন্দর ভুবনে, মানবের মাঝে আমি বাঁচিবারে চাই।"

আজ থেকে ৮৪ বছর আগে রবি ঠাকুর প্রয়াত হন। এই মহাবিশ্বে এখনও পর্যন্ত আমাদের জানা একমাত্র প্রাণের গ্রহ এই পৃথিবী। বড় অদ্ভুত রবির গভীর দূরদৃষ্টি; তিনিই লেখেন, "মহাবিশ্বে মহাকাশে মহাকাল-মাঝে আমি মানব একাকী ভ্রমি বিস্ময়ে..."

৩. রবি কত দূরে?

অফিস যেতে যেতে মনে হলো—রবি কত দূরে? রবি নেই কিন্তু চারপাশেই তার পরশ। তিনি বেঁচে আছেন আমাদের চিন্তায়, আমাদের প্রতিদিনের লড়াইয়ে আর এই বৃষ্টির ছোঁয়ায়।

30 Dec 2025

গোপেন বাবুর ফর্মিকিউরিয়াম এবং দুর্ধর্ষ পিঁপড়ের কামড়

শখের এন্টোমলজিস্ট গোপেন বাবু

আমাদের প্রতিবেশী গোপেন বাবু আমার কাকার বন্ধু। একটা স্কুলে জুলজি পড়ান এবং শখের এন্টোমলজিস্ট। শুনেছি গোপেন বাবু ছোটবেলায় গঙ্গাফড়িং দেখেই প্রাণীবিদ্যার প্রেমে পড়েন। মাস্টার্স করার সময় ইথোলজি’র স্যার তাঁকে একবার ‘গুবরে’ পোকা বলায়, আর কখনো বিশ্ববিদ্যালয়ে পা মাড়াননি।

বাড়িতে বিভিন্ন পোকামাকড়ের কলোনি বানিয়ে গোপেন বাবু তাদের আচরণ ও অভ্যাস পর্যবেক্ষণ করেন। প্রতিদিন সন্ধ্যায় তিনি আমাদের বাড়িতে কাকার সাথে আড্ডা দেন, লুডো খেলেন আর যত রাজ্যের পোকামাকড়ের অদ্ভুত সব আচরণের গল্প শোনান।

হারকিউলাস বিটল যারা নিজের ওজনের প্রায় ৮০০ গুন ভার বইতে পারে, ব্রাজিলিয়ান ট্রি হপার, অস্ট্রেলিয়ার ওয়াকিং স্টিক বা উড়ন্ত স্করপিয়নের গল্প গোপেন বাবুর কাছেই শোনা। পোকামাকড়ে আমার ইন্টারেস্ট না থাকলেও তাঁর কন্টিনিউয়াস ধারাভাষ্য আমার কান ফাঁকি দিতে পারেনা।

কীটপতঙ্গ বনাম পোকামাকড়

আমি অবশ্যি এই বিষয়ে শুধু গোপাল ভট্টাচার্যির নাম শুনেছি। তাঁর একটা বইও আছে, 'বাংলার কীটপতঙ্গ'। কাকা জেনেবুঝে “পোকামাকড়’ বলে কিনা জানিনা, তাতে গোপেন বাবুর গোসা হয়; বলেন, ‘পোকামাকড়’ নয়, বলো ‘কীটপতঙ্গ’। আমার কাছে দুটিই সমান।

কুমোর বোলতা এক ধরনের ছোট্ট বোলতা, যে একা একা বাসা বানায়। মাটির কাদায় সে ছোট একটা হাড়ির মতো এই বাসা  কাদা মাটি দিয়ে তৈরি করে

গোপেন বাবুর রিডিংরুমে সব দেশী-বিদেশী জার্নাল আর নানান পোকামাকড়ের বই। ইনসেক্টোলজি, বাগোলজি, আরাকনোলজি, লেপিডোপ্টেরোলজি, এপিওলজি। সবই মাকড়সা, প্রজাপতি, মথ, বিটল, মৌমাছি বিষয়ে লেখা । বারান্দা আর ঘর মিলিয়ে যে ল্যাবরেটরি বানিয়েছেন সেটা কাঁচ আর তারের জালি দিয়ে ঘেরা। ভেতরে কাচের জার, পোর্সেলিনের বিভিন্ন বয়ম, পোড়া মাটির মালসা, কলসি বিভিন্ন সাইজের কাঁচের আর প্লাস্টিকের টিউব দিয়ে জুড়ে বিভিন্ন পোকার কৃত্রিম কলোনি। আমায় বলেছেন, এসবই নাকি এক একটা ফর্মিকিউরিয়াম। বাগানে দুটি বি-হাইভ আছে কিন্তু কোনও দিন চাক ভেঙে মধু খেয়েছেন বলে মনে হয় না।

পিঁপেঁ সাম্রাজ্যের অন্দরমহল

খাবার হিসেবে চিটেগুড়, চিনির দলা, চাল-গম আর গাছের পাতা-ফুলের স্টক থাকে সেখানে। শুনেছি মাঝে মধ্যে জ্যান্ত ইঁদুরও নাকি পোকাদের খাওয়ার মেনু হিসেবে থাকে। পি-এইচ মাত্রা ঠিক রাখা দশ লিটারের জার থেকে নির্দিষ্ট সময়ে জল খাওয়ানোর ব্যবস্থা আছে।

হারভেস্টার অ্যান্ট অর্থাৎ মেসর পিঁপড়েদের জন্য আলাদা করে গম, ছোলা, বাদাম রাখা আছে। ওদের কাজই নাকি মাঠ থেকে দানা কুড়িয়ে এনে গুদাম ভরা। গোপেন বাবু বলেছিলেন, মেসররা একবার খাবার জমালে দুর্ভিক্ষেও না খেয়ে মরে না! আবার কার্পেন্টার অ্যান্টদের জন্য অন্য বন্দোবস্ত। বড় কালো পিঁপড়ে। এদের দেখতে ভারী, চলাফেরা ধীর কিন্তু ভয়ানক ধৈর্যশীল। কাঠে গর্ত করে বাসা বানায়, কাঠ খায় না কিন্তু কাঠ কেটে কেটে বাড়িটাই শেষ করে দেয়। গোপেন বাবু হেসে বলেছিলেন, এরা শ্রমিক শ্রেণির মতো পিঁপড়ে; নিঃশব্দে কাজ করে।

অস্ট্রেলিয়ান রাইডারের আক্রমণ

কাকার সাহায্য নিয়ে গোপেন বাবু একটা ল্যাবরেটরি বানিয়েছেন। সেখানে পোকামাকড়দের উপর ম্যাগনেটিক ফিল্ড, ইলেকট্রিক ফিল্ড, বিভিন্ন রঙের আলো এবং নানান আতরের গন্ধ কেমনভাবে তাদের গতি প্রকৃতি আর আচরণে প্রভাব ফেলে তা পর্যবেক্ষণ করার যন্ত্রপাতি আছে। কাকার কাছেই শুনেছি, গোপেন বাবু শুরুটা করেছিলেন উই দিয়ে। কিন্তু তাঁর স্ত্রী বলেছিলেন, ‘বাড়িতে হয় উই থাকবে অথবা আমি’। উই বাড়িতে ঠাঁই পায়নি।

শনিবার সকালে গোপেন বাবুর সাথে দেখা। বললেন, “আজ অস্ট্রেলিয়ান রাইডারের নতুন কলোনি আসছে। কাকার খবরটা দিও।” সন্ধ্যায় আড্ডায় গোপেন বাবু জানালেন, অস্ট্রেলিয়ান রাইডার বা বুলডগ পিঁপড়ে বিষাক্ত এবং প্রায় ৩০ মিলিমিটার সাইজের হয়। এদের খাদ্য অন্য পিঁপড়ে। তিনি এদের ছেড়েছেন লাল পিঁপড়েদের কলোনিতে। বিকেলে দেখা গেল রাইডারগুলো লাল পিঁপড়ে ধরে ধরে খাচ্ছে।

বাঁচার লড়াই

রোববার বিকেলে রাইডারের কলোনিটি দেখতে গিয়ে মনে হলো লাল পিঁপড়েরা কেমন যেন সন্ত্রস্ত! কিন্তু যেটা দেখে ভালো লাগল সেটা হলো, দল বেঁধে লাল পিঁপড়েরা রাইডারদের সাথে সমানে লড়ে যাচ্ছে। ফেরার সময় মনে হলো, লাল পিঁপড়েগুলো জিতে গেলেই ভালো!

দু’দিন গোপেন বাবুর দেখা নেই। বুধবার রাত্তিরে যখন এলেন, দেখলাম তাঁর মুখটা কেমন ফোলা ফোলা। কাকার কাছে স্বীকার করলেন, সোমবার রাইডারগুলো সব শেষ আর লাল পিঁপড়েরা সেই কলোনির দখল নিয়েছে। একটা রাইডারও আস্ত নেই। গোপেন বাবুকে বেশ ম্রিয়মাণ লাগছে কিন্তু আমার কেন জানিনা বেশ আনন্দ হচ্ছে! তিনি ফের বললেন, সেই লাল পিঁপড়ে কেমন ভাবে যেন এমন কামড় দিয়েছে, দু’দিন বসতেই পারেননি।

হঠাৎ মনে হলো, পোকামাকড়দের মধ্যে সবচেয়ে বড় মস্তিষ্ক তো পিঁপড়েদেরই। আর তাদের মধ্যে লাল পিঁপড়ে বা মেসর পিঁপড়েরা যারা দল বোঝে, সময় বোঝে; তাদের কালেকটিভ ইন্টিলিজেন্স যে কোনও প্রতিকূল পরিস্থিতিকে মোকাবিলা করতে শেষ চেষ্টা করে যায়। মনে হলো, সভ্যতা শুধু হিংস্রতায় টিকে থাকে না, টিকে থাকে যারা জোটবদ্ধ হয়ে লড়ে, তাদের হাতেই শেষ পর্যন্ত ক্ষমতা যায়।

29 Dec 2025

জিঙ্গল, কাঁপুনি এবং জিগলিং: ট্যাবলেটের সাথে এক সন্ধ্যা

A steaming cup of tea on a wooden table with a conceptual overlay showing molecular vibration

রাতে আমার ভাইপো, অর্কপ্রভ ওরফে ট্যাবলেট-এর সাথে শব্দজব্দ খেলছিলুম। খুব একটা ঠান্ডা নেই, তবুও গা গরম রাখতে বার কয়েক চা খেয়েছি। প্রথম দানেই ট্যাবলেট আমায় একদম কাবু করে ফেলল।

(১)

খেলাটা শুরু হলো এইভাবে - ট্যাবলেট যা প্রশ্ন করবে, আমায় তার ভুল উত্তর দিতে হবে। পরপর তিনটি প্রশ্নের উল্টোপাল্টা উত্তর শুনে, ও দুম করে জিজ্ঞাসা করল, “কাকা তোমায় ক’টা প্রশ্ন করেছি?” আমি সহজভাবে 'তিন' বলায় ও হেসে বলল, “উঁহু, তুমি ফেল!” আমি ব্যাপারটা বুঝেই বললুম, “শেষ প্রশ্ন ধরলে চার, তাই আমি তিনে সেরেছি!”

18 Dec 2025

আপনাদের ভালোবাসায় ১,০০০ ভিউ-এর মাইলফলক স্পর্শ!

GoSolarBangla ব্লগে ১,০০০ ভিউ মাইলফলক

আপনাদের ভালোবাসায় আমাদের প্রথম হাজার!

প্রিয় পাঠক,

অত্যন্ত আনন্দের সাথে জানাচ্ছি যে, সবার ভালোবাসা এবং সহযোগিতায় আজ আমার এই ব্লগের মোট ভিউ সংখ্যা ১,০০০ পার করল! মাত্র কয়েকদিন আগে শুরু করা এই যাত্রায় আপনারা যেভাবে পাশে দাঁড়িয়েছেন, তাতে আমি সত্যিই অভিভূত।

বিজ্ঞান অনেক সময় জটিল মনে হয়। বিজ্ঞানকে সাধারণ মানুষের কাছে নিয়ে যাওয়া খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সেই কারণেই সহজ বাংলায় বিজ্ঞান উপস্থাপন করাই এই ব্লগের প্রধান লক্ষ্য। সাধারণ পাঠকের কাছে, জটিল বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব বোধগম্য করে তোলার চেষ্টা ধারাবাহিকভাবে করে চলেছি।

GoSolarBangla: ১০০০ ভিউ মাইলফলক (১৮-১২-২০২৫)
মোট পেজ ভিউ (Cumulative) ১,০১৮
সক্রিয় পাঠক (Active Users) ৩২
গড় এনগেজমেন্ট টাইম ৪ মি. ০৫ সে.
টপ সোর্স Direct / Referral
স্ট্যাটাস সফলভাবে মাইলফলক স্পর্শ 🎉

চিত্র: ১৮ই ডিসেম্বর ২০২৫ তারিখের ব্লগের কিউমুলেটিভ পরিসংখ্যান।

বিশেষ করে আজকের 'কোয়ান্টাম জগত' এবং আমার পুরনো 'সোলার প্যানেল' সংক্রান্ত পোস্টগুলোতে আপনাদের ব্যাপক আগ্রহ আমাকে দারুণ অনুপ্রাণিত করেছে। বিজ্ঞানের জটিল বিষয়গুলোকে সহজ বাংলায় আপনাদের সামনে নিয়ে আসার যে ক্ষুদ্র চেষ্টা আমি করছি, এই ১,০০০ ভিউ তারই সার্থকতা। এই ভিউ পরিসংখ্যান আমার কাছে কেবল সংখ্যা নয়, এটি পাঠকদের সময়, মনোযোগ এবং বিশ্বাসের প্রতিফলন।

একজন ব্লগারের কাছে প্রথম এক হাজার ভিউ পাওয়াটা পাহাড় জয়ের মতোই আনন্দের। আপনাদের প্রতিটি ক্লিক, প্রতিটি মন্তব্য আমাকে আরও ভালো লেখার সাহস জোগায়। এমনকি যারা নীরবে পড়েন, তারাও এই যাত্রার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

ভবিষ্যতে আরও গভীরভাবে কোয়ান্টাম বিজ্ঞান, সোলার প্যানেল ও সোলার প্রযুক্তি, এবং জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা বৈজ্ঞানিক ভাবনা নিয়ে লেখার পরিকল্পনা রয়েছে। আপনাদের সহযোগিতা ও ভালোবাসা থাকলে সামনে আরও নতুন, রহস্যময় ও চিন্তা-উদ্দীপক বিষয় নিয়ে আপনাদের কাছেই ফিরে আসব। ধন্যবাদ আপনাদের সবাইকে।

সবাই ভালো থাকুন, সুস্থ থাকুন। শুভ ব্লগিং!


পছন্দের কিছু লেখা (Must Reads):

এই ব্লগের দর্শন জানতে পড়ুন: GoSolarBangla: দর্শন

9 Dec 2025

GoSolarBangla: আমাদের চিন্তা ও ব্লগের মূল দর্শন

চিন্তাভাবনা: স্মৃতির সংরক্ষণশালা

স্মৃতি… প্রতিটি ভাবনা আমাদের মস্তিষ্কের গভীরতম মেমরি সেলে জমা থাকে। কিন্তু সময়ের নিরন্তর প্রবাহে মনের গভীরে রাখা সেই তথ্য ক্রমশ ধূসর হয়ে আসে। এই বিলীন হওয়ার ভয় থেকেই মানবজাতি আদিমকাল থেকেই বাহ্যিক সংরক্ষণ কৌশল ব্যবহার করে আসছে।

GoSolarBangla Blog: ডিজিটাল সংরক্ষণশালা

ইন্দোনেশিয়ার মরক্কো দ্বীপে পাওয়া প্রায় ৩৫,০০০ বছর আগেকার রঙমাখা হাতের ছাপের গুহাচিত্র ছিল সেই আদিম মনের ভাবনার প্রথম ছাপ। পেশাদার লেখক নই, কিন্তু নিজের ভাবনা লিপিবদ্ধ করতে বাধা কোথায়? তাই যা ভাবি, যা বিশ্বাস করি, তাই লিখে রাখার চেষ্টা করি। হাতের কাছে যা পাই, তাই ডিজিটাইজড করি — কারণ জীবন ও জগতের টপিকের শেষ নেই।

লেখার দিশা ও বৈচিত্র্য

আমার আগ্রহ ও লেখার মূল ফোকাসগুলি বহুমুখী:

  • বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি: বিজ্ঞানের ছাত্র হিসেবে, এই জগতের বিস্ময় ও আবিষ্কারের প্রতি আমার স্বাভাবিক আকর্ষণ রয়েছে।
  • বিকল্প শক্তি (Renewable Energy): একজন পেশাদার হিসেবে, মানুষের কাছে ভবিষ্যতের শক্তির প্রয়োজনীয়তা ও ব্যবহারিক দিক তুলে ধরার তাগিদ অনুভব করি।
  • রাজনীতি ও সমাজচেতনা: সামাজিক মানুষ হিসেবে রাজনীতির বাইরে থাকা অসম্ভব। সমাজে আমার শ্রেণীগত অবস্থান, আমার লেখায় সেই শ্রেণির কণ্ঠস্বরই প্রতিফলিত করবে — এটাই স্বাভাবিক।

প্রকৃতি: মানব সভ্যতার মৌলিক ভিত্তি

আমার সবচেয়ে প্রিয় দর্শন হলো সাস্টেইনেবল ডেভেলপমেন্ট (Sustainable Development)। তাই প্রকৃতির ভারসাম্য অক্ষুণ্ণ রাখাই আমার মূল ফোকাস।

রবীন্দ্রনাথের সেই চিরায়ত উপলব্ধি, “দেখা হয় নাই চক্ষু মেলিয়া, একটি ধানের শীষের উপর একটি শিশির বিন্দু।” প্রকৃতিকে জানার জন্য দূরে যেতে হবে না; জানলা খুললেই যে জগৎ দেখা যায়, তাই আমাদের প্রকৃতি। তাই আমার লেখায় বারে বারে এই প্রাকৃতিক জগৎ ও তার গুরুত্বই ফিরে আসে।

আসলে, বিজ্ঞান হোক বা সমাজ ; Nature হলো এই মানব সভ্যতার মৌলিক ভিত্তি। এই ভিত্তি যদি ধ্বংস হয়, তাহলে আমাদের সব অর্জন অর্থহীন হয়ে যাবে।

চিন্তার “দরজা” খোলার আমন্ত্রণ

চেক কবি মিরোস্লাভ হোলুবের বিখ্যাত কবিতা “The Door” আমাদের এক গভীর আহ্বান জানায়, মনের দরজা খুললে অন্তত এক ঝলক টাটকা হাওয়া বা নতুন অভিজ্ঞতা আসবেই।

Go and open the door.
Maybe outside there’s
a tree, or a wood,
a garden,
or a magic city.

আমাদের প্রতিটি লেখাকে সেই এক-একটি দরজা মনে করতে পারেন, যা হয়তো আপনার মনে নতুন কোনো চিন্তা, বিতর্ক বা অভিজ্ঞতার দিকে এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ তৈরি করবে।

প্রত্যাশা

এই ভাবনাগুলি যদি আপনাদের চিন্তা ও অনুভূতিকে সমৃদ্ধ করে নতুন কোনো দৃষ্টিভঙ্গি বা পথের দিশা দিতে পারে, তবেই এই ডিজিটাল সংরক্ষণশালার প্রচেষ্টা সার্থক হবে।

সোলার প্রযুক্তির খুঁটিনাটি বিষয়গুলো সহজ বাংলায় আপনাদের কাছে পৌঁছে দেওয়াই আমার লক্ষ্য। এই ব্লগের পেছনের গল্প ও উদ্দেশ্য জানতে আমার আমাদের সম্পর্কে (About Us) পেজটি দেখে নিতে পারেন।

8 Dec 2025

পড়ুন: জিঙ্গল, কাঁপুনি এবং জিগলিং: ট্যাবলেটের সাথে এক সন্ধ্যা

ফড়িংয়ের আনন্দ আর বিবাগী পলু চাষি

অকারণেই আজ সকালে ফুটপাথে দাঁড়িয়ে মাছ বিক্রি দেখছিলাম। কেজিতে কুড়ি টাকা লাভ; শনি-রবিবারে ২০-২৪ কেজি মাছের বেচাকেনা। বিক্রি না-হওয়া মাছ লাভ কমিয়ে দেয়, তবে দশ কেজি পাইকারি মাছে ৫০০ গ্রাম বাড়তি পাওনা কিছুটা পুষিয়ে দেয়। নিউ টাউনের উৎপাত বাহিনী সামাল দিতে নিয়মিতই লাভের টাকাতেই খরচ মেটাতে হয়।

হালকা রোদ্দুর ছিল, কিন্তু উত্তরের হাওয়া লাগছিল না। খেয়াল করলাম, অনেক ফড়িং আর সাদা প্রজাপতি উড়ে বেড়াচ্ছে। ক’দিন আগেই ঘাসের বনে প্রচুর ধূসর প্রজাপতি দেখেছিলাম। রাতে ঘর-বারান্দাতেও উড়ে বেড়িয়েছে। সকালে কাচের স্লাইডিং পাল্লা খুলে দিয়েছিলাম, যাতে বাইরে বেরিয়ে যায়।

(১)

ফড়িং আর সাদা প্রজাপতির উড়ান দেখে দুটি গানের কথা মনে পড়ল—যদিও দুটিই ভ্রমর-সংক্রান্ত। ‘ভ্রমর সেথা হয় বিবাগী, নিভৃত নীল পদ্ম লাগি…’। আরেকটি, ‘আজ ভ্রমর ভোলে মধু খেতে, উড়ে বেড়ায় আলোয় মেতে…’।

দেখছিলাম, সাদা প্রজাপতির ক্ষেত্রে ‘উড়ে বেড়ায় আলোয় মেতে’—একেবারেই যথার্থ। ওরা এদিক-ওদিক উড়ে, নেচে বেড়াচ্ছিল যেন আনন্দে আত্মহারা! রাস্তার ধারে খুব বেশি ফুল নেই; মাধবীলতা, কিছু রঙ্গন আর কয়েকটি বুনো সাদা ফুল

ফড়িংদের উড়ান ছিল ছ’ফুট চওড়া ফুটপাথে ২৫-৩০ ফুট এলাকা জুড়ে। কিসের আনন্দে আজ ওরা এমন আত্মহারা কে জানে! কেউ বিবাগী নয়; কাছেই কোনো ঝোপঝাড়ে জন্মেছে, বেড়ে উঠেছে, আবার নতুন জন্ম দেবে! ক্ষণিকের জীবন: প্রজাপতির এক মাসের বেশি নয়; ফড়িং হয়তো ছ’মাস।

(২)

আজ সকালে এক অদ্ভুত, অথচ অবশ্যম্ভাবী খবর দেখলাম। মুর্শিদাবাদে যারা একদিন পলু চাষ করত, যাদের দুয়ারে ক্রেতারা রেশম কিনতে আসত, আজ তারাই বাইরে গিয়ে দিনমজুরির শ্রম বিক্রি করছে! দিন বদলেছে, কিন্তু পলু চাষিদের অবস্থার কী হল? তারা-ই তো আজ বিবাগী, বাঁচতেই হবে।

(৩)

পলু তো লার্ভা; পলু পোকা যখন গুটি (কোকুন) তৈরি করে, তখন সেই গুটি থেকেই রেশম সুতা বের করা হয়। গুটি থেকে রেশম না তুললে মথ বেরিয়ে আসে। কেউ কখনো 'মথ চাষ' বলে না—অদ্ভুত না?

পড়ুন: মাগুরলা টিলা আর বনমোরগের ডাক

6 Dec 2025

মাগুরলা টিলা আর বনমোরগের ডাক

মাগুরলা টিলার বিভ্রম ও বনমোরগের ডাক

মাগুরলা পাহাড় বললে ভুল হবে, টিলা বলাই ঠিক। টিলার দক্ষিণ ঢাল নেমে গিয়ে মিলেছে বড় এক দিঘির সঙ্গে। সেই দিঘিতে শীতেও আসে বহু পরিযায়ী পাখি, আর জলভর্তি থাকে ওয়াটার লিলিতে।

বিকেলে আমি দিঘির দিকে যে কেন যাচ্ছি, তা নিজেও জানি না। পাখি হতে পারে, প্রজাপতি হতে পারে, এমনকি বুনো কুলের লোভও হতে পারে। যাই হোক, মাগুরলা টপকাতেই হবে। হুড়া–মানবাজার সড়ক ছেড়ে টিলার পশ্চিম দিক থেকে উত্তর ঢাল ধরে পূর্বে এগোচ্ছি। মাঝখানে জঙ্গল পার হয়ে টিলা পেরোতে হবে।

নিউটাউনের কাছে জলা-জঙ্গল: এক দাঁড়াশ আর শিয়ালদের অভয়ারণ্য

জায়গাটি নিউটাউনের মধ্যেই। আমাদের ফ্ল্যাট থেকে মেরেকেটে আড়াই কিলোমিটার উত্তর-পূবে। ধারেকাছে কোনও জনবসতি নেই। পৌঁছানোর রাস্তাটা এই একটা বিস্তীর্ণ জলা-জঙ্গলের সামনে শেষ। রাস্তা যেখানে শেষ, তারপরেই জীর্ণ খাল আড়াআড়ি ভাবে পশ্চিম থেকে উত্তরে চলে গেছে। অন্য প্রান্ত দেখা যায় না। খাল পেরোলেই বুক পর্যন্ত ঘাসে ঢাকা বিল। বিলের ওপারে সবুজ ধানের ক্ষেত।

এই জায়গায় অনেকবার গেছি। প্রথম বার একটা ধূসর রঙের পাঁচ-সাত ফুটের দাঁড়াশ সাপকে রাস্তা পার হতে দেখে নাম দিয়েছিলুম দাঁড়াশের বন। জায়গাটা যেন প্রকৃতির খুব কাছাকাছি।

দাঁড়াশের বন: নিউ টাউনের অন্দরে এক টুকরো বন্য প্রকৃতি

ছবিঃ নিউ টাউন কলকাতার আবাসন এলাকার পাশে নিচু জলাভূমি এবং সবুজ ঘাসে ঢাকা মাঠ

(১)

দাঁড়াশের বনে পৌঁছানোর রাস্তাটি দুই লেনের। রাস্তার ডান দিকে-বাঁ দিকে বাবলা, সোনাঝুরি, কুল, সিরিষ, কৃষ্ণচূড়া, রুদ্রপলাশের মতো গাছ আর ঘন কাশের জঙ্গল। ডিভাইডারে বুনোফুলে জঙ্গল। শীতের আগে নাম না জানা অনেক ফুলে জায়গাটা নিজের মতো সেজে ছিল।

রাস্তার পাশ দিয়ে ৩৩ কেভি বিদ্যুতের লাইন জলাভূমি পেরিয়ে দূরে কোথাও চলে গেছে। রাস্তাটা শেষ প্রান্তে একদিকে একফালি জমি, তার ওপাশে বড় গাছের জঙ্গল, মাঝে একটা বড় জলাশয়। উল্টো দিকে বাঁশের বেড়া দেওয়া বাগানে শীতের ফসলের চাষ।

নির্জন এই জায়গায় কেবলমাত্র দু’বারই এক চাষিকে বাগানের কাজ করতে দেখেছি। প্রথম বার চাষের কথা জিজ্ঞাসা করায় বলেছিল, বৃষ্টিতে বাঁধাকপি, ফুলকপি, ওলকপি, মূলো — সবই নষ্ট হয়েছে, আবার নতুন করে লাগানোর কাজ করছেন। দ্বিতীয় বার সেই চাষিকে মেটে কচু তুলতে দেখেছিলাম।

চিত্রঃ নিউ টাউনের স্যাটেলাইট ভিলেজে লোকাল ভেজিটেবল ফার্মিং

দাঁড়াশের বনে অনেক প্রজাপতি, ফড়িং আর পাখি। ছাতার, দোয়েল, ফিঙে, বক, শালিক, ঘুঘু, সবুজ সুইচোরা, মাছরাঙা আর পানকৌড়ি — নানান ধরনের পাখি।

(২)

দু’সপ্তাহ আগে কোনও এক রবিবার সকালে দাঁড়াশের বনে গিয়েছিলাম। প্রতিবারের মতো লিওঁ সঙ্গে ছিল। খালের ধারে উঁচু মাটির ঢিবিতে বসে নিস্তব্ধতার আঁচ নিচ্ছিলাম। লিওঁ যথারীতি বন্ধনহীন, মুক্ত। এদিক-ওদিক ঘুরে বেড়াচ্ছে। কখনও লাফিয়ে খালে নেমে সাঁতার কাটছে। আমরা পাখি আর প্রজাপতি দেখছিলাম।

বাগানের উল্টো দিকের জঙ্গলে কয়েকটি খেঁজুর গাছের গোড়ায় ঘন ঘাসের মধ্যে বড় গর্ত দেখে মনে হয়েছিল, বন্যপ্রাণীর আস্তানা। ভাম বা খটাশ হতে পারে, এমনকি শেয়ালের কথাও মনে এসেছিল।

সে সময় আমি খেঁজুর জঙ্গলের সামনে দাঁড়িয়ে পায়ের ছাপ লক্ষ্য করার চেষ্টা করছি। লিওঁ হঠাৎ জলায় নেমে সাঁতার কাটা শুরু করে। আমি দূরে কোথাও কোলাহলের শব্দ শুনতে পেলাম।

লিওঁ ঝটপট জল থেকে উঠে গা ঝাড়া দেয়। কোলাহলের শব্দ আরও স্পষ্ট হচ্ছে। আমার মনে হল, শেয়ালের ডাক। আমার বলা হয়তো শেষও হয়নি, দেখলাম চল্লিশ ফুট দূরে একটা শেয়াল রাস্তা পেরিয়ে বাগানের দিক থেকে জঙ্গলের দিকে যাচ্ছে।

আমাদের পরিবারের অন্যতম সদস্য লিওঁ — একটি ন’বছর বয়সের মেল জার্মান শেফার্ড (GSD)। এই বয়সেও ওর দৃষ্টি আর ঘ্রাণশক্তি অটুট। কোথাও ঘুরতে গেলে লিওঁ-র সঙ্গে থাকাটা মানে কিছুটা বাড়তি হুজ্জুতি আর অনেকটা বাড়তি আনন্দ।

(৩)

লিওঁ উত্তেজিত; তার থেকে আমি বেশি উত্তেজিত, কারণ লিওঁকে শেয়াল আক্রমণ করতে পারে। বোকা লিওঁ শেয়ালের দিকে তেড়ে যেতে পারে। লিওঁ নাক তুলে দূর থেকে ভেসে আসা অচেনা গন্ধ বোঝার চেষ্টা করছে।

দ্রুত গাড়িতে উঠে লিওঁর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে চাইলাম। লিওঁকে নিয়ে গাড়ির দিকে এগোতেই আরও পাঁচ-ছয়টি শেয়াল কুড়ি-পঁচিশ ফুট দূরে নিজেদের ‘গান গাইতে গাইতে’ জঙ্গলের দিকে চলে গেল।

আমরা ততক্ষণে গাড়িতে। পেছনের শেয়ালটি জঙ্গলে ঢোকার আগে খোলা জমিতে দাঁড়িয়ে আমাদের বোঝার চেষ্টা করে নিল। এত দ্রুত ঘটনা ঘটে গেল যে ছবি তোলার সুযোগ পাইনি।

ফেরার সময় মনে হচ্ছিল আর ক’দিন পরেই এই জলা-জঙ্গল ভ্যানিশ হবে। আর সে সময় দুষ্টু বালিকা, লা নিনা এই পথ দিয়েই আসবে। আমরা তার দুষ্টুমি সামলাতে অস্থির হব।

ছবিঃ নিউটাউনের মাঝেই আবাসন এলাকায় কাশের জঙ্গল

4 Dec 2025

আর্নেস্ট পাউলি: আধুনিক কোয়ান্টাম পদার্থবিদ্যার অন্যতম স্থপতি

উলফগ্যাঙ পাউলি: অঘটনঘটনপটু এক পদার্থবিদের গল্প

Wolfgang Pauli — pioneer of quantum physics

আধুনিক কোয়ান্টাম পদার্থবিদ্যার স্থপতি উলফগ্যাঙ পাউলি

সুইস ফেডারেল ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক উলফগ্যাঙ আর্নেস্ট পাউলি – আধুনিক কোয়ান্টাম পদার্থবিদ্যার একজন অন্যতম স্থপতি। ১৯৪৬ সালে নোবেল প্রাইজ পাওয়ার পর আইনস্টাইন পাউলিকে তাঁর যোগ্য উত্তরসূরির স্বীকৃতি দিয়েছিলেন।

অঘটনঘটনপটু ‘পাউলি এফেক্ট’

পাউলি ছিলেন অঘটনঘটনপটু! তিনি যদি কখনও কোনও এক্সপেরিমেন্টের কাছাকাছি চলে আসতেন, তখন যন্ত্রপাতিগুলি হঠাৎ কাজ করা বন্ধ করত বা ল্যাবে দুর্ঘটনা ঘটত। সহকর্মীরা মজা করে একে বলতেন ‘পাউলি এফেক্ট’। এমনকি একবার ল্যাবে দুর্ঘটনা ঘটার সময় পাউলি সেখানে ছিলেন না, পরে জানা যায় তিনি যে ট্রেনে ছিলেন সেটি তখন ল্যাবের পাশ দিয়েই যাচ্ছিল!

এক্সক্লুশন প্রিন্সিপ্যাল (Exclusion Principle)

সহজ কথায়, একটি পরমাণুর মধ্যে প্রতিটি ইলেকট্রনের কোয়ান্টাম অবস্থা আলাদা। খানিকটা বহুতল হস্টেল বিল্ডিংয়ের সিঙ্গেল শেয়ার রুমে যেমন দুজন আবাসিক একসাথে থাকতে পারেন না, ইলেকট্রনরাও তেমন।

অপবিজ্ঞানকে ব্যাখ্যা করার সময় পাউলি বলতেন, ‘এটা ভুলও নয়’ (Not even wrong)। অর্থাৎ গবেষণা পত্রটি এতটাই আজগুবি যে তাকে ভুল বলার মতো যুক্তিও নেই!

মুরগিটি রাস্তা পার হল কেন? এই ধাঁধায় পাউলির উত্তর হতো— “এপারে আরও একটি মুরগি ছিল!” তাঁর এক্সক্লুশন প্রিন্সিপ্যাল অনুযায়ী, একই পরমাণুর কোনো দুটি ইলেকট্রনের চারটি কোয়ান্টাম নাম্বার এক হতে পারে না!

পাউলি ছিলেন বিংশ শতাব্দীর অন্যতম প্রতিভাবান পদার্থবিজ্ঞানী। ১৯০০ সালে জন্ম নেওয়া এই বিজ্ঞানী ১৯৫৮ সালে বিদায় নিলেও কোয়ান্টাম বলবিজ্ঞানের কোপেনহেগেন ব্যাখ্যায় তাঁর অবদান আজও অম্লান।

3 Dec 2025

আলী সাহেব ও জীবনের এক কাপ চা: হাসতে হাসতে বেঁচে থাকার রসায়ন

syed mujtaba ali: an eminent student of rabindranath tagore


মুজতবা আলীর সাথে এক কাপ চা: জীবন, হাসি ও রেজিলিয়েন্স

আলী সাহেবকে জিজ্ঞাস করলুম, "আলী সাহেব, আপনার লেখা পড়ি.. মনে হয় লাইফ ইজ জাস্ট আ কমেডি শো, কিন্তু বাস্তবে তো দুনিয়া বহুত সখ্‌ত জায়গা হ্যায়।"

তিনি মুচকি হেসে জবাব দিলেন, "আরে ভাই, কঠিন তো আছেই। কিন্তু দেখো, জিন্দাগী এক চা-ই কি পিয়ালি হ্যায় — ঠাণ্ডি হো তো বেকার, লেকিন গরম হো তো ভি হাত জলা দেতি হ্যায়।"

(১)

"তাইলে সমাধানটা কী?" জিজ্ঞেস করতেই আলী সাহেবের পাল্টা প্রশ্ন, "তুমি কি বাঙাল?" আমি 'হ' বলতেই শুরু করলেন তাঁর সেই চিরচেনা স্টাইলে, "শোনো, সিপ ইট স্লোলি উইথ অ্যা স্মাইল। সংসার, চাকরি, পড়া, লিখা সবই করতে হবে স্টেডি পেসে। কিন্তু আজকালকার পোলাপানরা সবাই তো তাড়াহুড়া করে; ক্যারিয়ার, মানি, ফেম..। লক্ষ্য পূরণ না হইলে জেহ্‌নি দবাও (মানসিক চাপ)। তাই তো সাহেব কইলেন, "যো হাস্‌তে হাস্‌তে গির্‌তা হ্যায়, উও জলদি উঠ্‌ জাতা হ্যায়। যো রোতে রোতে গির্‌তা হ্যায়, উও জমিন পর লম্বা পড়্‌ জাতা হ্যায়।"

(২)

আমি বুঝলাম হাসি হইলো গিয়া রেজিলিয়েন্স। সাহেব বললেন, "একদম। আর শেখার আসল মানে কি জানো? নিজেরে নিয়ে হাসতে শেখা। যখন মানুষ নিজের ভুল নিয়েও হেসে নিতে পারে, তখনই সে এডুকেটেড হয়ে ওঠে। জিন্দেগী কো সিরিয়াস মাত লো, ওরনা তুমহে জোকে বানা দেগি। যে হাসতে হাসতে নিজের ওপর মজা করতে পারে, তার কাছে জেহ্‌নি দবাও নেহি টিকে।"

হাসি হলো সেরা মেডিসিন উইদাউট এনি প্রেসক্রিপশন। কফি আর সিগারেট শেষ করে মুজতবা আলী বিদায় নিলেন।

(৩)

কফি সিগারেট শেষ। মুজতবা আলী বিদায় নিলেন। জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে দেখি বকুলতলা থেকে ভেসে এলো তাঁর স্বর - যেখান দিয়ে হেসে গেছে, হাসি তার রেখে গেছে রে। মনে হল আঁখির কোণে আমায় যেন ডেকে গেছে সে।

আরে কী আশ্চর্য! আমি তো এই কথাই ভাবছি, "আমি কোথায় যাব, কোথায় যাব, ভাবতেছি তাই একলা বসে।"

হুদুড় দুর্গা: পাথুরে টাঁড় ও অরণ্যের অধিকার রক্ষার এক মহাকাব্যিক লড়াই

হুদুড় সোরেন: ভূমির অধিকার ও প্রতিরোধের উপাখ্যান

ঝাড়খণ্ড আর পশ্চিমবঙ্গের সীমান্তের গ্রাম আটনা। পলাশ, কুসুম, মহুয়া, অর্জুন আর শালের জঙ্গলের ধারে শুকনো, পাথুরে প্রান্তর-টাঁড়। টুকরো টুকরো পাথরের স্তূপ, ঝাঁটি আর খাঁ-খাঁ ঝাড়জঙ্গল। বর্ষায় একটি ফসল ওঠে, শীতের শেষ পর্যন্ত গরু-মোষ চড়ানোর ঘাস থাকে। বসন্তে শিমুল–পলাশ লাল রঙে চারপাশ রাঙায়, অথচ এখানকার মুন্ডা আর খারিয়াদের জীবন বর্ণহীন।

Sunset in Atna Village Purulia

চিত্রঃ আটনা গ্রামে সূর্যাস্ত

এই পাথুরে টাঁড়ে প্রতিদিন ঘুরে বেড়াত হুদুড় সোরেন, কাঁড়ার পিঠে চড়ে। তার চোখ শান্ত, নির্ভীক। পিতৃপুরুষের থেকে পাওয়া এই টাঁড়ই তার আশ্রয়, গর্ব এবং শিকড়। অর্জুন, হপন, সুকিলাল — হুদুড়ের বন্ধু এবং গ্রামবাসীরাও প্রতিদিন তার সঙ্গে থাকে টাঁড়ের পথে।

কিন্তু এক বসন্তে শহর থেকে আসে বাবুরা। ব্যাগ ভর্তি যন্ত্রপাতি, কাগজ-কলম। কানাঘুষো ছড়িয়ে পড়ে, এই মাটির নিচে আছে অভ্র। লুটেরাদের নজর জঙ্গলের এই টাঁড়ে। কর্পোরেট কোম্পানির সিইও নারায়নী ঘোষণা করে, “কিছু টাকা দিচ্ছি এই জায়গা ছেড়ে দাও, না হলে উচ্ছেদ করব।”

হুদুড় বুঝেছিল, এই টাঁড় চলে গেলে ভাত জুটবে না। সে দাঁড়ায় লাঠি হাতে। তার ডাকেই গ্রামবাসী জেগে ওঠে। মুন্ডা, খারিয়া, সাঁওতাল - সবাই নামে। লড়াই শুরু হয়। কাঁড়ার পিঠে হুদুড় সবার আগে, লাঠি উঁচিয়ে বলে, “এই জমি আমাদের, আমাদের সন্তানদের। হাজার বছর ধরে আমরা এর সঙ্গে বাঁধা।”

নারায়নীর নির্দেশে পুলিশ গুলি চালায়। হুদুড়ের বুক রক্তে ভিজে যায়। মাটিতে পড়ে গেলেও তার চোখে ভয় নেই। শুধু এক ঝলক আগুন অস্ফুটে বলে, “ভূমিপুত্রকে মেরে ফেলা যায়, কিন্তু ভূমির অধিকার মুছে ফেলা যায় না।”

হুদুড়ের মৃত্যুর পর রাতের আঁধারে জন্ম নেয় প্রতিজ্ঞা। হপন, সুকিলাল, অর্জুনরা শপথ নেয়, “হুদুড়ের রক্ত বৃথা যাবে না।” এক গভীর রাতে, ঝোপঝাড় জেগে ওঠে। দাউ দাউ করে জ্বলতে থাকে লুটেরাদের তাবু। নারায়নী পালায় আতঙ্কে। যদিও শহরের মিডিয়া নারায়নীকে ‘উন্নয়নের দূত’ বলে প্রচার করে, হুদুড়কে বলে ‘দুষ্কৃতী’, কিন্তু জঙ্গল অন্য কথা বলে।

পাথুরে জঙ্গলে, শালপাতার ভাতের ধোঁয়ার মধ্যে হুদুড়কে কেউ ভোলে না। মুন্ডাদের গানে, সাঁওতালদের ঢোলের তালায় হুদুড় সোরেন হয়ে ওঠে ‘হুদুড় দুর্গা’ - জঙ্গলের বীর। শিশুরা শোনে তার বীরত্বের গল্প। নারীরা গলায় হার মেলায় পলাশ ফুলের, বলে, “হুদুড়ের রক্তেই আমাদের বসন্ত রাঙা।”

হুদুড়ের নাম আজ প্রতিরোধের প্রতীক। টাঁড়ের প্রতিটি পাথরে লেখা হয়ে যায়, এই মাটি বিক্রি নয়, এই মাটি আমাদের।

রায়হানার নবমীর সাজ ও অদ্ভুত পাগলামি

রায়হানা দিদির 'হেয়ার কেয়ার' ও নবমীর অদ্ভূত সন্ধে

সকাল থেকেই মালুম হচ্ছিল আজ কিছু একটা হুলস্থুল ঘটবে। বাড়ির সবার চেপে রাখা উত্তেজনা। রায়হানা আমার দিদি, কিন্তু খুব একটা বড় নয়। গত রাতেই বলেছে আজ নবমীর সন্ধেয় বন্ধুদের সঙ্গে ঘুরতে বেরোবে।

নবমীর সাজে রায়হানা চুলচর্চা আর কৌতুকপূর্ণ উন্মাদনা

ছবিঃ নবমীর সাজে রায়হানা চুলচর্চা আর কৌতুকপূর্ণ উন্মাদনা

আমি তখনও ঘুম থেকে উঠিনি। সকাল আটটাতেই দিদি কন্ডিশনার শ্যাম্পুর বোতল নিয়ে ঢুকেছে বাথরুমে। মা ধৈর্য হারিয়ে বলছে, “কি রে, এতক্ষণ ধরে শ্যাম্পু?” বন্ধ দরজার ওপার থেকে ভেসে এলো দুটি শব্দ, “হেয়ার কেয়ার!”

আমি ততক্ষণে সকালের ব্রেকফাস্ট শেষ করেছি। দশটা বাজে। বুঝলাম এবার চুল শুকোনোর পালা। হেয়ার ড্রায়ার চলছে। দিদি নিজের সঙ্গেই কথা বলছে “আজকের চুল একদম বিজ্ঞাপনের মতো চকচক করতে হবে।”

(১)

দুপুরে খাওয়া শেষ। দিদি বলে, ঘুমালে নাকি মুখ ফোলাফোলা লাগে। তাই দুপুরে ঘুমায়নি। সারা দুপুর কাটল সাজুগুজুর টিপস, একে ওকে ফোন, বন্ধুদের সঙ্গে আলাপ আর সাজুগুজুর গল্পে।

বিকেলে ফেসওয়াশ দিয়ে শুরু। তারপর টোনার, ময়েশ্চারাইজার প্রতিটি পর্ব শেষ হচ্ছে অতি যত্নের সঙ্গে। ফাউন্ডেশন লাগাতে গিয়ে আয়নার সামনে বেশ কিছুক্ষণ নিজের মুখের সঙ্গে কথা বলল “আজকে আমাকে চিনতে পারবে তো সবাই?” কনসিলার দিয়ে ডার্ক সার্কেল ঢাকা, তারপর ব্লাশ আর হাইলাইটার। আমি উস্কে দিয়ে বললাম, “গাল একেবারে আলোয় ঝলমল করছে।” দিদি ঠোঁট বেঁকিয়ে বলল, “যাঃ!”

(২)

সন্ধ্যার প্রস্তুতি শুরু হলো। ভ্রু টেনে শেপ দেওয়া হলো। চোখে বাদামি আইশ্যাডো, ওপর দিয়ে কালো আইলাইনার টানা। কাজল বসাতেই চোখ যেন হঠাৎ করে গভীর হয়ে উঠল। মাসকারা দিয়ে পলক দীর্ঘ হলে নিজেই বলল, “এ কি! আমার চোখ!”

এবার খোঁপার পালা। খোপা বানানো হলো, কিন্তু ফুল নেই। দিদি বলল, “ফুল কোথায়?” আমি ভয়ে জবার কথা না বলে বাগান থেকে গোলাপ এনে দিলাম।

প্রস্তুতি প্রায় শেষ। এবার সবচেয়ে জটিল কাণ্ড শাড়ি পরা। দেরাজের সমস্ত শাড়ি বিছানায় লাট করা হচ্ছে, কোনোটাই পছন্দ হচ্ছে না। শেষে ঠিক হলো লাল সোনালি কাতান শাড়ি। আঁচল ঝলমল করছে। গলায় সরু সোনার চেন, কানে ঝুমকা, হাতে লাল চুড়ি। কপালে গোল লাল টিপ বসাতেই সাজ সম্পূর্ণ হলো।

(৩)

এর মাঝেই দিদির বন্ধুরা ঝুমাদি, লাবনি, পিয়াসী সবাই হাজির। আমায় নির্দেশ দেওয়া হলো হালকা গোলাপি রঙের বেল্ট দেওয়া চটি বের করতে। তাই করলাম।

দিদিও রেডি। কিন্তু এ কী কাণ্ড! আয়নার দিকে তাকিয়ে দিদি ঘোষণা করল, “না! আমি আজ বাইরে ঘুরতে যাব না। সাজুগুজু নষ্ট হয়ে যাবে।”

দিদির পাগলামি আর অদ্ভুত কাণ্ডকারখানা আমি আর বুঝতে পারি না। আমি বাড়ির বাইরে। রাস্তার দোকানে অর্জুনদা বসেছিল। চেঁচিয়ে বলল, “রায়হানা কোথায় রে?” আমি কোনও উত্তর দিইনি, তবে মনে মনে বলেছি, চুপচাপ বসে থাক চাঁদু।

ট্যাবলেটের অদ্ভুত শব্দ-যন্ত্র ও শব্দজব্দ

শব্দজব্দ বনাম দুষ্টু জব্দ: তিলু দাদুর চিঠি

ক্যুরিয়ারে চিঠিটি আজই পেলুম। কাকার সংগ্রহে পুরোনো 'আনন্দমেলা' থেকে ঠিকানাটা পেয়ে ঝাড়খণ্ডের গিরিডিতে ত্রিলোকেশ্বর শঙ্কু দাদুকে চিঠি লিখেছিলুম। এত তাড়াতাড়ি উত্তর পাব বলে অবশ্য আশা করিনি। চিঠিতে লিখেছেনঃ

সোনার বাংলা ও গুলসিঁতাঁ হামারা: এক ফোনে মিলে যাওয়া দুই সুরের কথা

(১)

পাঞ্জাব থেকে ফোন এবং প্রশ্ন। তুম লোগ আজ গাও সোনার বাংলা ..., ম্যায় ইধর পাঞ্জাব মে বেটা হুঁ, কেয়া গাও ম্যায়?

আমি একটু অবাক হয়েছি। ব্যাটা খবরও রাখে। বললাম, ইউ ক্যান অলসো সিং সোনার বাংলা ...... রবীন্দ্রনাথ টেগোর ......।

ও একটু চুপ করে থেকে বলে, আজ ম্যায় ইকবাল কা হি গীত গাউঙা। লেকিন ইয়ে দেশ .......  ইয়ে দেশ মেরা ভি হ্যায়, ইয়ে দেশ ভি গা সকতা হুঁ।

গুলমোহর: কৃষ্ণচূড়ার ঝরা পাতা আর লাল আগুনের অপেক্ষা

নিউটাউনে পলাশ ফুল

প্রকৃতি আমাদের দুহাত ভরে দেয়, কিন্তু আমরা কি সবসময় তার মূল্য বুঝতে পারি? কখনো কখনো রাস্তার ধারের একটি মহীরুহ আমাদের কাছে কেবলই একগুচ্ছ শুকনো পাতা বা হাঁটাচলার পথে সামান্য বাধা হিসেবে ধরা দেয়। কিন্তু সেই প্রতিটি গাছের ডালপালা আর শিকড়ের গভীরে লুকিয়ে থাকে লড়াই আর বেঁচে থাকার এক অনন্য ইতিহাস। রোদ-ঝড়-জল সামলে বেড়ে ওঠা একটি কৃষ্ণচূড়া বা গুলমোহর কেবল গাছ নয়, বরং সে সময়ের এক নীরব সাক্ষী। সময়ের আবর্তে তার রূপ বদলায়। কখনো সে রিক্ত, কখনো বসন্তের রক্তিম আভায় উদ্ভাসিত। অথচ অবলীলায় কেউ বলে ওঠে, "কেটে ফেললেই ভালো হয়।" এই নিষ্ঠুরতা আর কৃষ্ণচূড়ার অবিচল লড়াইয়ের প্রেক্ষাপটেই আজকের এই স্মৃতিকথা।

চিত্রঃ নিউটাউনের রাস্তার ধারে ফুটে থাকা লাল পলাশ

(১)

গতকাল রাস্তার ধারে যে কৃষ্ণচূড়া গাছের তলায় ক্যাম্প করেছিলাম, ফুটপাতে পড়ে থাকা হলুদ ঝরাপাতা পরিস্কার করার সময় একজন বলছিল, গাছটি ঝামেলা করছে, কেটে ফেললেই ভালো হয়।

কথাটা কানে আসতেই, আঁতকে উঠি। আমাদেরও তো একটি কৃষ্ণচূড়া আছে, নিজেরাই যত্নকরে বড় করেছি। বহুকাল আগে সম্পূর্ণ ন্যাড়া গাছটি দেখে মনে হয়েছিল, হয়তো মরেই যাবে, কিন্তু বেঁচে গেছে। মাঝে একবার প্রচন্ড ঝড়ে ভেঙে পরে কিন্তু ফের মাথা তুলেছে।

(২)

রাস্তার ধারে অনেক কৃষ্ণচূড়া আছে, কিন্তু এই গাছটি বিশেষত্বহীন বিশেষ গুলমোহরশিমুল-পলাশের পাশে এই গুলমোহর বেমানান; আলাদা কোনও আদিখ্যেতা নেই।

সে আপন মনে দোলে কখনো দখিনা হাওয়ায় কখনও শীতের হাওয়ায়। চৈত্র বৈশাখের দাবদাহে সে নিরুত্তাপ। সারা বছরই তার সবুজ পাতার ডাল, ফুটপাথে নুইয়ে থাকে।

চিত্রঃ নিউটাউনের রাস্তার ধারে ফুটে থাকা লাল কৃষ্ণচূড়া

গুলমোহরের সুবাস নেই তবে ভিন্ন ঋতুতে তার ভিন্ন বাহার। ন্যাড়া, ঘন সবুজ পাতার ছাওয়া আর সবুজ পাতার ফাঁকে লাল ফুল।

চারিদিক ছাতিম ফুলের গন্ধ মাতোয়ারা কিন্তু বৈচিত্রহীন গুলমোহর এই হেমন্তেও অবিচল, শীতের আগমন বার্তা দিচ্ছে। পাতা হঠাৎ বিবর্ণ হতে শুরু করেছে; হলুদ পাতা ঝড়ছে।

অদ্ভুত না! ঝরা হালকা সবুজ পাতার ফাঁকে লাল রঙের কিছু গুলবাহার এখনও নিজেদের উপস্থিতি জানান দিয়েছে।

(৩)

আর মাত্র মাস খানেক বাদেই গুলমোহর ন্যাড়া হবে কিন্তু আমি নিশ্চিত তার আগেই সবুজ পাতা ডালেডালে মাথাচাড়া দেবে। এবং গ্রীষ্ম আসার আগেই যেন সবাইকে দুপুরের প্রখর রৌদ্রের আলো পাতার আড়ালে রেখে পথিকের বিশ্রামে নিজেকে মেলে ধরবে।

শুধু অপেক্ষা বসন্তের এবং বিদায়। কৃষ্ণচূড়ার জন্য অপেক্ষা মানেই — লাল আগুনের জন্য অপেক্ষা।

Featured post

National Green Hydrogen Mission India: লক্ষ্য, প্রযুক্তি ও ভবিষ্যৎ

ভারতের National Green Hydrogen Mission কী, কেন এটি গুরুত্বপূর্ণ, এবং কীভাবে এটি ভারতকে একটি Global Green Hydrogen Hub বানাতে পারে - ...

পপুলার পোস্ট