আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনে ভরশূন্যতা কেন অনুভূত হয়?
মাটি থেকে প্রায় ৪০০ কিলোমিটার উপরে আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনের নভোচররা প্রায় ৯০ মিনিটে পৃথিবীর চারদিকে একবার ঘুরে আসে। তাদের গতি প্রায় ২৮,০০০ কিলোমিটার প্রতি ঘণ্টা। এই ঘটনাটি অনেকটা সূর্যের চারদিকে পৃথিবীর ঘোরার মতো। তবে এখানে একটি বড় ফারাক হলো মহাকর্ষের টান। সূর্যের টান যেমন পৃথিবীতে অনুভূত হয় না, তেমনি আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনের নভোচরদের পৃথিবীর টান মালুম হয় না।
৪০০ কিলোমিটার উপরে কি গ্র্যাভিটি থাকে না?
পৃথিবীর মহাকর্ষীয় টান মাটি থেকে ৪০০ কিলোমিটার উপরে প্রায় ৯০ শতাংশ। অর্থাৎ, পৃথিবীতে যদি কোনো বস্তুর ওজন ১ কেজি হয়, তাহলে মহাকাশ স্টেশনে তার ওজন হবে প্রায় ৯০০ গ্রাম। এই টান কম হলেও এটি শূন্য নয়। তাহলে প্রশ্ন হলো, কেন নভোচররা ওজনহীনতা অনুভব করে?
মনে করা যাক, একটি লিফট একজন যাত্রীকে নিয়ে উঁচু থেকে বাধাহীনভাবে পড়তে শুরু করল।
- ১ সেকেন্ড পরে লিফটের গতি হবে ৯.৮১ মিটার প্রতি সেকেন্ড
- ২ সেকেন্ড পরে হবে ১৯.৬২ মিটার প্রতি সেকেন্ড
- ৩ সেকেন্ড পরে হবে ২৯.৪৩ মিটার প্রতি সেকেন্ড
এই অবস্থায় লিফটের ভেতরের যাত্রী নিজেকে ভরশূন্য অনুভব করবে, কারণ যাত্রী এবং লিফট দুটোই একই ত্বরণে নিচে পড়ছে।
আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশন চিরস্থায়ী মুক্ত পতন
আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশন এবং এর নভোচররা পৃথিবীর চারদিকে একটি নির্দিষ্ট কক্ষপথে ঘুরছে। কক্ষপথে থাকাকালীন স্টেশনটি এবং এর ভেতরের সবকিছু পৃথিবীর দিকে মুক্ত পতনের মধ্যে রয়েছে। প্রায় ২৮,০০০ কিলোমিটার প্রতি ঘণ্টা গতিতে এটি বক্রাকার পথে পৃথিবীর দিকে পড়ার পাশাপাশি সামনের দিকে এগিয়ে যায়। ফলে এটি পৃথিবীতে আছড়ে পড়ে না, বরং একটি নির্দিষ্ট পথে স্থির থাকে।
৪০০ কিলোমিটার উঁচুতে প্রতি সেকেন্ডে এই স্টেশনটির ত্বরণ প্রায় ৮.৬৯ মিটার প্রতি বর্গ সেকেন্ড, যা লিফটের উদাহরণের তুলনায় সামান্য কম।
এই ত্বরণের কারণেই মহাকাশ স্টেশন এবং এর ভেতরের সবকিছু মুক্ত পতনের মধ্যে থাকে ফলে নভোচররা ভরশূন্যতা অনুভব করে।
মাইক্রোগ্র্যাভিটি কেন সম্পূর্ণ শূন্য নয়?
বায়ুমণ্ডলের বিস্তৃতি প্রায় ১০,০০০ কিলোমিটার পর্যন্ত, ফলে মহাকাশ স্টেশন সামান্য বায়ু প্রতিরোধের মুখে পড়ে এবং ধীরে ধীরে কক্ষচ্যুত হয়। প্রতি মাসে প্রায় দুই কিলোমিটার উচ্চতা কমে আসে এবং নিয়মিত এটিকে পুনরায় কক্ষপথে ঠেলে দিতে হয়।
এই কারণেই আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনের ভেতরে একেবারে শূন্য গ্র্যাভিটি নয়, বরং মাইক্রোগ্র্যাভিটি বিদ্যমান থাকে যা কার্যত অনুভূত হয় না।
মহাকাশে বস্তুর পারস্পরিক টান
মহাকাশ স্টেশনের ভেতরে বিভিন্ন ভরের বস্তু একে অপরকে আকর্ষণ করলেও, এই টান বিভিন্ন দিকে হওয়ায় মোট প্রভাব প্রায় শূন্য হয়ে যায়।
শেষ কথা
এত লেখার পরেও মনে হয়, এত তো ভালোই আছি। সূর্যের চারদিকে ঘুরতে থাকা এই পৃথিবী একটি কৃত্রিম বস্তু নয়, উপগ্রহ নয় বরং একটি প্রাণচঞ্চল গ্রহ। মাধ্যাকর্ষণ ছাড়াও এখানে অনেক টান আছে ফিস কবিরাজি, ফুচকা, চমচম আরও কত কী!
No comments:
Post a Comment