অদৃশ্য চিঠি এবং একটি চাঁদরাতের গল্প
স্মৃতির বাঁকে সেই শেষ চিঠি
হাতের মুঠোয় চাপা আছে এক টুকরো কাগজ; তারার আলোয় লেখা ঝাপসা অক্ষরে। শব্দগুলো পড়া যায় না, কিন্তু প্রতিটি বর্ণ যেন হারুনের হৃদয়ে গেঁথে আছে: “আমরা যুদ্ধে মরিনি, বেটা... বেঁচে আছি প্রতিটি চাঁদরাতে।”
নয়কুড়ি কান্দার রক্তভেজা ইতিহাস
ওপার দেখা যায় না। হোগলা, নলখাগড়া, পানিফলের জঙ্গলে ঢাকা এই নয়কুড়ি কান্দার ছয়কুড়ি বিল। ১৯৭১-এর সেই ভয়াল দিনে এই বিলের বুকে ছড়িয়ে পড়েছিল রক্তের গন্ধ। মুক্তিযোদ্ধা রহিম সিদ্দিকীর ডান পায়ে গুলি লাগে, মাত্র দু’দিন টিকেছিল। শেষ নিঃশ্বাসের আগে তাঁর লেখা শেষ চিঠি মায়ের হাতে পৌঁছেছিল চৈত্রের এক বিষন্ন সকালে।
চাঁদের আলোয় বাবার ছায়া
বিলের বাঁধে চিৎ হয়ে শুয়ে হারুন আজ ঈদের চাঁদের দিকে তাকিয়ে আছে। আবছা আলোয় পানিফলের সাদা ফুলগুলো যেন জ্বলজ্বলে মোমবাতি। কোথাও শোনা যায় শাপলার পাতায় টুপটাপ জল পড়ার শব্দ। হারুনের চোখ ভেজা অস্ফুটে বলে “বাবা, আজ তুমি আসবে তো?”
হঠাৎ হারুনের মনে হল কেউ যেন বলছে, “কেন আসব না? চাঁদ তো উঠেছে...” হারুন ঘুরে তাকায়। বিলের জলে চাঁদের প্রতিবিম্বে যেন ভেসে উঠেছে বাবার ছায়া, কম্যান্ডো প্যান্ট, গায়ে মোটা সুতির গেঞ্জি। রহিম সিদ্দিকী হাসছে।
বিলের ওপার থেকে ভেসে আসে ভাটিয়ালি সুর: “যুদ্ধে হারায় নি কেউ, ভাই... চাঁদ যতদিন উঠবে, ততদিন বেঁচে থাকব।”
উপসংহার: অমরত্বের গান
হারুন উঠে বসে। বিলের জলে এখন ভেসে বেড়ায় অসংখ্য তারা, যেন আকাশ নেমে এসেছে মাটির কাছাকাছি। সে জানে, আগামী চৈত্রে আবারও কোনো এক অচেনা হাতে আসবে বাবার চিঠি। আর প্রতিটি চাঁদরাতে এই বাঁধেই মিলবে বাবার সাথে কথার সেতু।
যুদ্ধে মরে না, হারুন... যুদ্ধ বেঁচে থাকে চৈত্রের হাওয়ায়, শাপলার ফুলে, আর চাঁদের আলোয় লিখে যাওয়া অদৃশ্য চিঠিতে।
No comments:
Post a Comment