3 Apr 2025

ভারতের নতুন শ্রমকোড ২০২৫: অধিকার সংকোচন বনাম পুঁজির বিকাশ

নতুন শ্রম কোড ২০২৫: অধিকারের লড়াই বনাম পুঁজির স্বার্থ

শ্রম ও মূল্য: বিজ্ঞানের দৃষ্টিভঙ্গিতে অর্থনীতি

নিউটনের প্রথম সূত্রের মতোই বলা যায়, বাইরে থেকে শ্রমশক্তি প্রয়োগ না করলে বস্তুতে মূল্য যুক্ত হয় না। তুলা সংগ্রহ থেকে কাপড় তৈরি – এই পুরো প্রক্রিয়ায় শ্রম যুক্ত না হলে সুতো ও বস্ত্র তৈরির কথা কল্পনামাত্র।

উৎপাদনের জন্য চাই বিনিয়োগ। সরকার নিজে বিনিয়োগ করবে না, বরং ব্যক্তিমালিকানাধীন পুঁজিকে উৎসাহিত করে। আর পাঁচটি প্রয়োজনীয় শর্তের মধ্যে বিনিয়োগকারী শ্রমবাজারের অবস্থা যাচাই করে নেয়।

বিনিয়োগের রাজনীতি ও মজুরির দ্বন্দ্ব

বিনিয়োগকারী চায় কম বেতন ও কম সুযোগ-সুবিধার শ্রমিক-কর্মচারী। শ্রমিক-কর্মচারীরা ঠিক উল্টোটাই চায়। এই দরকষাকষি চলতেই থাকে।

বাস্তব ঘটনা হলো, উৎপাদন শিল্পের পুরো লাভ হলো শ্রমিক-কর্মচারীদের না দেওয়া মজুরি। সরকারের স্বার্থ হলো, যত লাভ তত ট্যাক্স।

শিল্পমালিক ও শ্রমিক-কর্মচারীদের সুবিধা আদায়ের দরকষাকষি বা লড়াই চলমান প্রক্রিয়া। সরকার তৃতীয়পক্ষ হিসেবে হস্তক্ষেপ করে কিছু সুযোগ-সুবিধা দিয়ে – মালিকের কথাও রইল, শ্রমিক-কর্মচারীদের কথাও রইল, আর মাঝখানে সরকারি রাজস্ব আদায়েও একটা মোটামুটি অবস্থা বজায় রইল।

শ্রম আইনের বিবর্তন ও নতুন 'শ্রম কোড ২০২৫'

স্বাধীনতার আগে ও পরে শ্রমজীবী মানুষের দীর্ঘ আন্দোলনের ফলে বারবার শ্রম আইন সংশোধন বা পরিবর্তন হয়েছে। ২০১৯-২০ সালে কেন্দ্রীয় সরকার 'শ্রমক্ষেত্র সংস্কার'-এর নামে ৪৪টি কেন্দ্রীয় শ্রম আইনের মধ্যে ১৫টিকে ‘বর্তমান সময়ের পক্ষে অপ্রাসঙ্গিক’ চিহ্নিত করে বাতিল করে, বাকি ২৯টি আইনের সুযোগ-সুবিধা কাটছাঁট করে চারটি শ্রমকোড আইন তৈরি করেছে। এই আইন কার্যকর হচ্ছে আজ থেকে, অর্থাৎ ১লা এপ্রিল ২০২৫।

লক্ষ্য করার বিষয় হলো, শ্রমকোড আইন চালু হওয়ার আগে পর্যন্ত দেশের বলবৎ শ্রম আইনের পেছনে ছিল শ্রমজীবী মানুষের অধিকার রক্ষার লড়াইয়ের বিজয়। নতুন আইনে শ্রমজীবী মানুষের অধিকার সঙ্কুচিত করে কেন্দ্রীয় সরকার এই লড়াইকে আরও তীব্র করে দিয়েছে।

কেন এই নতুন আইন বিতর্কিত?

এই আইনের পেছনে রয়েছে 'এক ঢিলে দুই পাখি মারা'র মতো বিপজ্জনক কৌশল:

১. শ্রমিক আন্দোলন দুর্বল করা: সংগঠিত শ্রমিক আন্দোলনকে দুর্বল করে সম্মিলিত দরকষাকষির ক্ষমতা কমিয়ে দেওয়া। ২. পুঁজির স্বার্থ রক্ষা: ৫ ট্রিলিয়ন ইকোনমির লক্ষ্যে শ্রমবাজারকে নমনীয় করে বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ করা।

প্রতিরোধের পথে শ্রমজীবী মানুষ

শ্রমজীবী মানুষের লড়াই আরও তীব্র হলো। ২০শে এপ্রিল, ২০২৫ এই রাজ্যের শ্রমজীবী মানুষ ব্রিগেডে সমবেত হবেন। এক মাস পরেই গোটা দেশে হরতাল ও ধর্মঘটের প্রস্তুতি চলছে। শোনা যাচ্ছে, দেশব্যাপী এই শ্রমকোড-বিরোধী আন্দোলনকে আরও তীব্র করে লাগাতার ধর্মঘটের দিকেও যেতে পারে।

শেষ কথা

এই শ্রম কোড আইনের প্রভাবে কেবল নিম্নবিত্ত নয়, বরং সমাজের সুবিধাভোগী শ্রেণি বা মধ্যবিত্তরাও পরোক্ষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তাই এই লড়াই আজ কেবল শ্রমিকের নয়, বরং একটি সুস্থ ও বৈষম্যহীন সমাজ গড়ার লক্ষ্যে সবার সম্মিলিত লড়াই।

No comments:

Post a Comment

Featured post

২০২৫ সালে ভারতের পুনর্নবীকরণযোগ্য শক্তি: সৌর ও বায়ুশক্তিতে রেকর্ড উৎপাদন

২০২৫ সালে ভারতের রিনিউএবল এনার্জি সেক্টর আর শুধু “অলটারনেটিভ” নয়; এখন সেটা দেশের পাওয়ার সাপ্লাই সিস্টেম-এর অন্যতম অংশীদার। সোলার, উইন্ড, ব...

পপুলার পোস্ট