গ্র্যাভিটি কী? আইনস্টাইন, স্পেস-টাইম ও LIGO | সহজ বাংলায় ব্যাখ্যা
আমাদের কাছে গ্র্যাভিটি বা মহাকর্ষের অর্থ হলো একটা অদৃশ্য টান। এই টানাটানির জন্যই গাছ থেকে আপেল মাটিতে পড়ে, চাঁদ পৃথিবীর চারদিকে চক্কর খায়, আর পৃথিবী ঘোরে সূর্যের চারদিকে। যেন এক ‘ভুতুড়ে দড়ি’ দিয়ে মহাবিশ্বের সবকিছুকে কেউ সবসময় নিজের দিকে টেনে ধরে রেখেছে। স্যার আইজ্যাক নিউটন এই টানের বিষয়টিকেই তাঁর গাণিতিক সূত্রের মাধ্যমে ব্যাখ্যা করেছিলেন।
আইনস্টাইনের ভিন্ন ভাবনা: স্পেস-টাইমের বক্রতা
কিন্তু আলবার্ট আইনস্টাইন গ্র্যাভিটিকে দেখেছিলেন একদম অন্যভাবে। তাঁর তত্ত্বে এই অদৃশ্য টানের জন্য দায়ী হলো স্পেস-টাইম (Spacetime)। মহাবিশ্বের যে কোনো ভারী বস্তুর উপস্থিতিতে এই স্পেস-টাইম দুমড়ে-মুচড়ে বা বেঁকে যায়।
এই দোমড়ানো-মোচড়ানো বিষয়টি গাণিতিক হলেও ভিজ্যুয়ালাইজ করা খুব একটা কঠিন নয়। প্রখ্যাত পদার্থবিদ রিচার্ড ফাইনম্যান এটি খুব সহজে বুঝিয়েছিলেন। আমরা জানি, সমতলে আঁকা একটি ত্রিভুজের তিনটি কোণের যোগফল ১৮০ ডিগ্রি এবং চতুর্ভুজের কোণগুলোর যোগফল ৩৬০ ডিগ্রি হয়। কিন্তু কোনো ভারী বস্তুর কাছাকাছি স্পেস-টাইম যেহেতু বেঁকে থাকে, সেখানে যদি আপনি সরলরেখা দিয়ে একটি ত্রিভুজ বা চতুর্ভুজ আঁকেন, তবে তাদের কোণের যোগফল কখনোই ১৮০ বা ৩৬০ ডিগ্রি হবে না। এই জ্যামিতিক অসামঞ্জস্যই প্রমাণ করে যে মহাকর্ষ আসলে কোনো সাধারণ টান নয়, বরং স্থানের বক্রতা।
মহাকর্ষীয় তরঙ্গ: স্পেস-টাইমের ঢেউ
মহাবিশ্বে যখন কোনো অতি-ভারী বস্তু (যেমন ব্ল্যাকহোল) আন্দোলিত হয়, তখন এই গ্র্যাভিটি তরঙ্গাকারে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। যেমন দুটি ব্ল্যাকহোল যখন একে অপরের সাথে মিশে যায়, তখন চারদিকের স্পেস-টাইম আন্দোলিত হয়ে ঢেউয়ের মতো ছড়িয়ে পড়ে। এই ছড়িয়ে পড়ার গতি আলোর গতির সমান।
একে জলের তরঙ্গের সাথে কল্পনা করলে সুবিধা হয়। শান্ত জলে ঢিল ছুড়লে যেমন ঢেউ বয়ে যায় এবং পরে জল আবার স্থির হয়ে যায়, গ্র্যাভিটেশনাল ওয়েভ বা মহাকর্ষীয় তরঙ্গও ঠিক তেমনি।
লিগো (LIGO): মহাবিশ্বের হৃৎস্পন্দন মাপার যন্ত্র
আমেরিকায় এই মহাকর্ষীয় তরঙ্গ নিরীক্ষা করার জন্য দুটি বিশেষ অবজারভেটরি আছে। এদের বলা হয় লিগো (LIGO - Laser Interferometer Gravitational-Wave Observatory)। এগুলো স্পেস-টাইমের অতি ক্ষুদ্র কোনো হঠাৎ পরিবর্তন মাপতে সক্ষম।
এই অবজারভেটরিগুলোতে ৪ কিলোমিটার লম্বা ‘L’ আকৃতির দুটি বায়ুশূন্য টানেল থাকে। এর ভেতর দিয়ে নির্দিষ্ট কম্পাঙ্কের লেজার আলো পাঠানো হয়। টানেলের সংযোগস্থলে এই দুই আলো মিশে একটি বিশেষ আলো-আঁধারের শেড (Interference Pattern) তৈরি করে।
এখন, যদি মহাবিশ্বের কোথাও কোনো বিশাল আলোড়ন ঘটে এবং তার মহাকর্ষীয় তরঙ্গ পৃথিবীর ওপর দিয়ে বয়ে যায়, তবে স্পেস-টাইমের সংকোচন-প্রসারণের ফলে লিগোর সেই ৪ কিলোমিটার লম্বা বাহু দুটির দৈর্ঘ্যের সামান্য হেরফের হয়। ফলে লেজার আলোর সেই শেড বা প্যাটার্ন বদলে যায়। এই অতি সূক্ষ্ম পরিবর্তন লক্ষ্য করেই বিজ্ঞানীরা মহাকর্ষীয় তরঙ্গ চিহ্নিত করেন।
একটি অবিস্মরণীয় আবিষ্কার
দুটি ল্যাবরেটরির দূরত্ব প্রায় ৩,০০০ কিলোমিটার। যেহেতু মহাকর্ষীয় তরঙ্গ আলোর গতিতে চলে, তাই দুটি অবজারভেটরিতে এই পরিবর্তনের সময়ের তফাত মেপে নিশ্চিত হওয়া যায় যে তরঙ্গটি মহাকাশ থেকেই এসেছে।
২০১৫ সালের সেপ্টেম্বরে লিগোতে প্রথমবার মহাকর্ষীয় তরঙ্গ ধরা পড়ে, যা তৈরি হয়েছিল আজ থেকে কোটি কোটি বছর আগে দুটি বিশাল ব্ল্যাকহোলের সংঘর্ষের ফলে। স্পেস-টাইমের এই আশ্চর্য চক্করে মহাবিশ্বে এমন কত না রোমাঞ্চকর ঘটনা ঘটে চলেছে, যা সাধারণ ক্লাসিক্যাল পদার্থবিজ্ঞান দিয়ে ব্যাখ্যা করা অসম্ভব।
বিজ্ঞানের আরও কিছু অবাক করা তথ্য জানতে পড়ুন: কোয়ান্টাম জগত ও অনিশ্চয়তা নীতি।
No comments:
Post a Comment