কোয়ান্টাম মেকানিক্স ও হাইজেনবার্গের অনিশ্চয়তা নীতি: এক রহস্যময় জগতের সহজ পাঠ
ওয়ার্নার হাইজেনবার্গকে নিয়ে একটি মজার গল্প প্রচলিত আছে। হাইওয়েতে প্রচণ্ড গতিতে গাড়ি চালিয়ে যাওয়ার সময় পুলিশ তাঁকে থামিয়ে জিজ্ঞাসা করল, "আপনি কি জানেন আপনি কত গতিতে গাড়ি চালাচ্ছিলেন?"
হাইজেনবার্গের উত্তর ছিল, "না… কিন্তু আমি জানি আমি ঠিক কোথায় আছি!"
গল্পটা মজার হলেও এর মধ্যে লুকিয়ে আছে ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র কণার জগতের জন্য তাঁর বিখ্যাত 'অনিশ্চয়তা নীতি' (Uncertainty Principle)।
রকেট বনাম ইলেকট্রন
রকেট উৎক্ষেপণ করে নির্দিষ্ট কক্ষপথে স্যাটেলাইট পৌঁছে দিতে নিউটনের গতিসূত্র ব্যবহার হয়। কত সময়ের মধ্যে কত দূরত্ব অতিক্রম করবে, তা সহজেই হিসেব করতে পারি। এই হিসাব নির্ভর করে বেগ, সময় ও ত্বরণের মতো পরিচিত রাশির ওপর। কিন্তু নিউট্রন, প্রোটন, ইলেকট্রন মতো অতিক্ষুদ্র কণার ক্ষেত্রে নিউটনের এই সূত্র কার্যকর নয়। কারণ এসব কণার আচরণ আমাদের দৈনন্দিন দৃশ্যমান জগতের নিয়ম মানে না; এদের অবস্থান ও বেগ একসঙ্গে নির্দিষ্টভাবে জানা যায় না। তাই এই ক্ষুদ্র জগতকে বোঝার জন্য ধ্রুপদি বলবিদ্যার বাইরে গিয়ে প্রয়োজন হয় এক সম্পূর্ণ ভিন্ন বিজ্ঞান - কোয়ান্টাম মেকানিক্স।
আলো কি কণা না তরঙ্গ?
১৮০১ সালে পদার্থবিদ থমাস ইয়ং তাঁর বিখ্যাত 'ডাবল স্লিট' পরীক্ষার মাধ্যমে আলোর তরঙ্গের ধর্ম প্রতিষ্ঠা করেন। অথচ নিউটন মনে করতেন আলো হলো কণার প্রবাহ। ১৮৬৫ সালে জেমস ক্লার্ক ম্যাক্সওয়েল গাণিতিক সমীকরণের মাধ্যমে দেখান যে আলো আসলে একটি তড়িৎচৌম্বকীয় তরঙ্গ।
১৯০৫ সালে আইনস্টাইন 'আলোক-তড়িৎ ক্রিয়া'র মাধ্যমে দেখালেন যে, আলো আসলে আলাদা আলাদা শক্তির 'প্যাকেট' বা দলার স্রোত। পরে যার নাম দেওয়া হয় 'ফোটন'। এখান থেকেই প্রতিষ্ঠিত হয় আলোর দ্বৈত সত্তা; আলো একই সাথে কণা এবং তরঙ্গ।
কণা যখন তরঙ্গ: ডি-ব্রগলি ও শ্রোয়েডিঙ্গার
বিজ্ঞানী লুই ডি-ব্রগলি ১৯২৪ সালে বললেন—আলোক তরঙ্গের যদি কণা ধর্ম থাকে, তবে কণাদেরও তরঙ্গের ধর্ম থাকা উচিত। ১৯২৫ সালে পদার্থবিদ আরউইন শ্রোয়েডিঙ্গার কণাদের এই তরঙ্গ ধর্মকে গাণিতিক সূত্র দিয়ে প্রকাশ করলেন। ১৯২৬ সালে পদার্থবিদ ম্যাক্স বর্ন বললেন, এটি একটি 'সম্ভাব্যতা তরঙ্গ' (Probability Wave)। অর্থাৎ একটি কণা ঠিক কোথায় আছে, তা নিশ্চিত করে বলা যায় না, শুধু তার থাকার সম্ভাবনা নির্ণয় করা যায়।
কোয়ান্টাম সুপারপজিশন: একই সাথে সব জায়গায়
কোয়ান্টাম জগতের সবচেয়ে বিস্ময়কর বৈশিষ্ট্য হলো সুপারপজিশন। সাধারণ জগতে একটি বস্তু এক সময়ে কেবল একটি নির্দিষ্ট স্থানেই থাকতে পারে। কিন্তু কোয়ান্টাম কণাগুলো (যেমন ইলেকট্রন) পর্যবেক্ষণের আগের মুহূর্ত পর্যন্ত সম্ভাব্য সব অবস্থায় বা সব জায়গায় একই সাথে অবস্থান করে। যতক্ষণ না আমরা কণাটিকে মাপছি বা দেখছি, ততক্ষণ সেটি একটি মেঘের মতো ছড়িয়ে থাকে। যেই মুহূর্তে আমরা পরীক্ষা করি, অমনি সেই 'সম্ভাব্যতা তরঙ্গ' ভেঙে পড়ে এবং কণাটি একটি নির্দিষ্ট রূপ ধারণ করে।
হাইজেনবার্গের অনিশ্চয়তা নীতি
ইলেকট্রনের এই বিচিত্র আচরণকে হাইজেনবার্গ তাঁর বিখ্যাত 'অনিশ্চয়তা নীতি' (Uncertainty Principle) দিয়ে ব্যাখ্যা করেছেন। এই নীতি অনুযায়ী, ইলেকট্রনের মতো ক্ষুদ্র কণাদের অবস্থান (Position) এবং ভরবেগ (Momentum) একই সাথে নিখুঁতভাবে পরিমাপ করা অসম্ভব।
যদি আপনি ইলেকট্রনটির অবস্থান খুব নিখুঁতভাবে জানতে চান, তবে তার গতিবেগ বা ভরবেগ অনিশ্চিত হয়ে পড়বে। আবার যদি গতিবেগ মাপতে যান, তবে তার অবস্থান অস্পষ্ট হয়ে যাবে। এটি মাপার যন্ত্রের কোনো ত্রুটি নয়, বরং এটি প্রকৃতিরই একটি মৌলিক সীমাবদ্ধতা। উদাহরণস্বরূপ, একটি হাইড্রোজেন পরমাণুর ইলেকট্রন কোনো নির্দিষ্ট পথে ঘোরে না, বরং প্রোটনের চারপাশে একটি 'ইলেকট্রন মেঘ' (Electron Cloud) তৈরি করে একই সাথে সর্বত্র অবস্থান করে।
কোপেনহেগেন ব্যাখ্যা ও সলভে কনফারেন্স
কোয়ান্টাম মেকানিক্সের এই বিচিত্র আচরণগুলোকে ব্যাখ্যা দিতে ১৯২৭ সালে নীলস বোর এবং হাইজেনবার্গ একটি তত্ত্ব দাঁড় করান, যা 'কোপেনহেগেন ব্যাখ্যা' (Copenhagen Interpretation) নামে পরিচিত। এটি অনুযায়ী, আমাদের পর্যবেক্ষণই বাস্তবতাকে নির্ধারণ করে। ১৯২৭ সালের বিখ্যাত 'সলভে কনফারেন্স' ছিল এই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু, যেখানে আইনস্টাইন কোয়ান্টাম অনিশ্চয়তাকে মেনে নিতে না পেরে বলেছিলেন, "ঈশ্বর পাশা খেলেন না।" জবাবে নীলস বোর বলেছিলেন, "ঈশ্বরকে কী করতে হবে তা আপনি বলে দেবেন না।"
উপসংহার
পরমাণু ভাঙা থেকে শুরু করে স্মার্টফোনের ট্রানজিস্টর, সবই এই কোয়ান্টাম মেকানিক্সের ওপর দাঁড়িয়ে। ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র এই জগত আমাদের শিখিয়ে দেয় যে, প্রকৃতি সবসময় আমাদের সাধারণ যুক্তি দিয়ে চলে না। সেখানে নিশ্চয়তার চেয়ে সম্ভাবনাই বেশি শক্তিশালী।

No comments:
Post a Comment