30 Dec 2025

গোপেন বাবুর ফর্মিকিউরিয়াম এবং দুর্ধর্ষ পিঁপড়ের কামড়

শখের এন্টোমলজিস্ট গোপেন বাবু

আমাদের প্রতিবেশী গোপেন বাবু আমার কাকার বন্ধু। একটা স্কুলে জুলজি পড়ান এবং শখের এন্টোমলজিস্ট। শুনেছি গোপেন বাবু ছোটবেলায় গঙ্গাফড়িং দেখেই প্রাণীবিদ্যার প্রেমে পড়েন। মাস্টার্স করার সময় ইথোলজি’র স্যার তাঁকে একবার ‘গুবরে’ পোকা বলায়, আর কখনো বিশ্ববিদ্যালয়ে পা মাড়াননি।

বাড়িতে বিভিন্ন পোকামাকড়ের কলোনি বানিয়ে গোপেন বাবু তাদের আচরণ ও অভ্যাস পর্যবেক্ষণ করেন। প্রতিদিন সন্ধ্যায় তিনি আমাদের বাড়িতে কাকার সাথে আড্ডা দেন, লুডো খেলেন আর যত রাজ্যের পোকামাকড়ের অদ্ভুত সব আচরণের গল্প শোনান।

হারকিউলাস বিটল যারা নিজের ওজনের প্রায় ৮০০ গুন ভার বইতে পারে, ব্রাজিলিয়ান ট্রি হপার, অস্ট্রেলিয়ার ওয়াকিং স্টিক বা উড়ন্ত স্করপিয়নের গল্প গোপেন বাবুর কাছেই শোনা। পোকামাকড়ে আমার ইন্টারেস্ট না থাকলেও তাঁর কন্টিনিউয়াস ধারাভাষ্য আমার কান ফাঁকি দিতে পারেনা।

কীটপতঙ্গ বনাম পোকামাকড়

আমি অবশ্যি এই বিষয়ে শুধু গোপাল ভট্টাচার্যির নাম শুনেছি। তাঁর একটা বইও আছে, 'বাংলার কীটপতঙ্গ'। কাকা জেনেবুঝে “পোকামাকড়’ বলে কিনা জানিনা, তাতে গোপেন বাবুর গোসা হয়; বলেন, ‘পোকামাকড়’ নয়, বলো ‘কীটপতঙ্গ’। আমার কাছে দুটিই সমান।

কুমোর বোলতা এক ধরনের ছোট্ট বোলতা, যে একা একা বাসা বানায়। মাটির কাদায় সে ছোট একটা হাড়ির মতো এই বাসা  কাদা মাটি দিয়ে তৈরি করে

গোপেন বাবুর রিডিংরুমে সব দেশী-বিদেশী জার্নাল আর নানান পোকামাকড়ের বই। ইনসেক্টোলজি, বাগোলজি, আরাকনোলজি, লেপিডোপ্টেরোলজি, এপিওলজি। সবই মাকড়সা, প্রজাপতি, মথ, বিটল, মৌমাছি বিষয়ে লেখা । বারান্দা আর ঘর মিলিয়ে যে ল্যাবরেটরি বানিয়েছেন সেটা কাঁচ আর তারের জালি দিয়ে ঘেরা। ভেতরে কাচের জার, পোর্সেলিনের বিভিন্ন বয়ম, পোড়া মাটির মালসা, কলসি বিভিন্ন সাইজের কাঁচের আর প্লাস্টিকের টিউব দিয়ে জুড়ে বিভিন্ন পোকার কৃত্রিম কলোনি। আমায় বলেছেন, এসবই নাকি এক একটা ফর্মিকিউরিয়াম। বাগানে দুটি বি-হাইভ আছে কিন্তু কোনও দিন চাক ভেঙে মধু খেয়েছেন বলে মনে হয় না।

পিঁপেঁ সাম্রাজ্যের অন্দরমহল

খাবার হিসেবে চিটেগুড়, চিনির দলা, চাল-গম আর গাছের পাতা-ফুলের স্টক থাকে সেখানে। শুনেছি মাঝে মধ্যে জ্যান্ত ইঁদুরও নাকি পোকাদের খাওয়ার মেনু হিসেবে থাকে। পি-এইচ মাত্রা ঠিক রাখা দশ লিটারের জার থেকে নির্দিষ্ট সময়ে জল খাওয়ানোর ব্যবস্থা আছে।

হারভেস্টার অ্যান্ট অর্থাৎ মেসর পিঁপড়েদের জন্য আলাদা করে গম, ছোলা, বাদাম রাখা আছে। ওদের কাজই নাকি মাঠ থেকে দানা কুড়িয়ে এনে গুদাম ভরা। গোপেন বাবু বলেছিলেন, মেসররা একবার খাবার জমালে দুর্ভিক্ষেও না খেয়ে মরে না! আবার কার্পেন্টার অ্যান্টদের জন্য অন্য বন্দোবস্ত। বড় কালো পিঁপড়ে। এদের দেখতে ভারী, চলাফেরা ধীর কিন্তু ভয়ানক ধৈর্যশীল। কাঠে গর্ত করে বাসা বানায়, কাঠ খায় না কিন্তু কাঠ কেটে কেটে বাড়িটাই শেষ করে দেয়। গোপেন বাবু হেসে বলেছিলেন, এরা শ্রমিক শ্রেণির মতো পিঁপড়ে; নিঃশব্দে কাজ করে।

অস্ট্রেলিয়ান রাইডারের আক্রমণ

কাকার সাহায্য নিয়ে গোপেন বাবু একটা ল্যাবরেটরি বানিয়েছেন। সেখানে পোকামাকড়দের উপর ম্যাগনেটিক ফিল্ড, ইলেকট্রিক ফিল্ড, বিভিন্ন রঙের আলো এবং নানান আতরের গন্ধ কেমনভাবে তাদের গতি প্রকৃতি আর আচরণে প্রভাব ফেলে তা পর্যবেক্ষণ করার যন্ত্রপাতি আছে। কাকার কাছেই শুনেছি, গোপেন বাবু শুরুটা করেছিলেন উই দিয়ে। কিন্তু তাঁর স্ত্রী বলেছিলেন, ‘বাড়িতে হয় উই থাকবে অথবা আমি’। উই বাড়িতে ঠাঁই পায়নি।

শনিবার সকালে গোপেন বাবুর সাথে দেখা। বললেন, “আজ অস্ট্রেলিয়ান রাইডারের নতুন কলোনি আসছে। কাকার খবরটা দিও।” সন্ধ্যায় আড্ডায় গোপেন বাবু জানালেন, অস্ট্রেলিয়ান রাইডার বা বুলডগ পিঁপড়ে বিষাক্ত এবং প্রায় ৩০ মিলিমিটার সাইজের হয়। এদের খাদ্য অন্য পিঁপড়ে। তিনি এদের ছেড়েছেন লাল পিঁপড়েদের কলোনিতে। বিকেলে দেখা গেল রাইডারগুলো লাল পিঁপড়ে ধরে ধরে খাচ্ছে।

বাঁচার লড়াই

রোববার বিকেলে রাইডারের কলোনিটি দেখতে গিয়ে মনে হলো লাল পিঁপড়েরা কেমন যেন সন্ত্রস্ত! কিন্তু যেটা দেখে ভালো লাগল সেটা হলো, দল বেঁধে লাল পিঁপড়েরা রাইডারদের সাথে সমানে লড়ে যাচ্ছে। ফেরার সময় মনে হলো, লাল পিঁপড়েগুলো জিতে গেলেই ভালো!

দু’দিন গোপেন বাবুর দেখা নেই। বুধবার রাত্তিরে যখন এলেন, দেখলাম তাঁর মুখটা কেমন ফোলা ফোলা। কাকার কাছে স্বীকার করলেন, সোমবার রাইডারগুলো সব শেষ আর লাল পিঁপড়েরা সেই কলোনির দখল নিয়েছে। একটা রাইডারও আস্ত নেই। গোপেন বাবুকে বেশ ম্রিয়মাণ লাগছে কিন্তু আমার কেন জানিনা বেশ আনন্দ হচ্ছে! তিনি ফের বললেন, সেই লাল পিঁপড়ে কেমন ভাবে যেন এমন কামড় দিয়েছে, দু’দিন বসতেই পারেননি।

হঠাৎ মনে হলো, পোকামাকড়দের মধ্যে সবচেয়ে বড় মস্তিষ্ক তো পিঁপড়েদেরই। আর তাদের মধ্যে লাল পিঁপড়ে বা মেসর পিঁপড়েরা যারা দল বোঝে, সময় বোঝে; তাদের কালেকটিভ ইন্টিলিজেন্স যে কোনও প্রতিকূল পরিস্থিতিকে মোকাবিলা করতে শেষ চেষ্টা করে যায়। মনে হলো, সভ্যতা শুধু হিংস্রতায় টিকে থাকে না, টিকে থাকে যারা জোটবদ্ধ হয়ে লড়ে, তাদের হাতেই শেষ পর্যন্ত ক্ষমতা যায়।

No comments:

Post a Comment

Featured post

২০২৫ সালে ভারতের পুনর্নবীকরণযোগ্য শক্তি: সৌর ও বায়ুশক্তিতে রেকর্ড উৎপাদন

২০২৫ সালে ভারতের রিনিউএবল এনার্জি সেক্টর আর শুধু “অলটারনেটিভ” নয়; এখন সেটা দেশের পাওয়ার সাপ্লাই সিস্টেম-এর অন্যতম অংশীদার। সোলার, উইন্ড, ব...

পপুলার পোস্ট