মাগুরলা টিলার বিভ্রম ও বনমোরগের ডাক
মাগুরলা পাহাড় বললে ভুল হবে, টিলা বলাই ঠিক। টিলার দক্ষিণ ঢাল নেমে গিয়ে মিলেছে বড় এক দিঘির সঙ্গে। সেই দিঘিতে শীতেও আসে বহু পরিযায়ী পাখি, আর জলভর্তি থাকে ওয়াটার লিলিতে।
বিকেলে আমি দিঘির দিকে যে কেন যাচ্ছি, তা নিজেও জানি না। পাখি হতে পারে, প্রজাপতি হতে পারে, এমনকি বুনো কুলের লোভও হতে পারে। যাই হোক, মাগুরলা টপকাতেই হবে। হুড়া–মানবাজার সড়ক ছেড়ে টিলার পশ্চিম দিক থেকে উত্তর ঢাল ধরে পূর্বে এগোচ্ছি। মাঝখানে জঙ্গল পার হয়ে টিলা পেরোতে হবে।
(১)
দূর থেকে দেখলাম চেনা মুখ, চম্পা মাহাতো। জঙ্গলের ধারে উঁকিঝুঁকি মারছে। সোজা পথ ছেড়ে টিলায় উঠতে যেতেই দেখি চম্পা আমার থেকে মাত্র কুড়ি গজ দূরে।
“এই চম্পা!” ডাক দিতেই সে ডান হাতের তর্জনী ঠোঁটের কাছে নিয়ে আমাকে চুপ করতে ইশারা করল।
তাড়াতাড়ি পা চালিয়ে ওর দিকে এগোলাম। শুকনো শালপাতার উপর হাঁটায় ‘মসমস’ শব্দ হলো। সঙ্গে সঙ্গে চম্পা তাঁর দু’হাত সমান্তরাল করে উপরে–নীচে নাচিয়ে বুঝিয়ে দিল পা টিপে টিপে হাঁটতে হবে।
(২)
আরও কাছে যেতেই সে ইশারায় দাঁড়িয়ে পড়তে বলল। আর তার পরেই অবাক কাণ্ড। চম্পা মুখ দিয়ে এমন এক শব্দ করল, যা স্পষ্ট জঙ্গল ফাউলের ডাক।
দু'তিনবার ডাকার পর সে কান পেতে কিছু শুনল। ঠিক সেই মুহূর্তেই টিলার ওপাশ থেকে আরেকটা জঙ্গল ফাউলের ডাক ভেসে এল। চম্পা মাথা দুলিয়ে, চোখ নাচিয়ে বোঝাল যে, যাকে সে খুঁজছিল, তাকে পেয়ে গেছে।
এবার আমিও সব বুঝলাম; চম্পার গুলতি বনমোরগ শিকারের জন্য, আর গলার স্বর হলো টোপ।
(৩)
আমি আর দেরি না করে জঙ্গলের সরু পথ ধরে টিলার ওপর উঠতে লাগলাম। উঠতে উঠতে নিচ থেকে ওপরে, আর ওপরে থেকে নিচে কয়েকবার ‘কোক্কোর কোঁ’ শব্দ কানে এল।
টিলার মাথায় পৌঁছাতেই দেখি ডান দিকে, দশ হাত দূরে, ভানু সোরেন একটা বড় পাথরের ওপর বসে একই কায়দায়, ঠোঁটের সামনে দু’হাতের তালুর ফাঁক দিয়ে ‘কোক্কোর কোঁ’ করছে।
(৪)
টিলার মাথায় দাঁড়িয়ে মুহূর্তেই পুরো ব্যাপারটা পরিষ্কার হলো। নিশ্চিত বুঝলাম, আজ কোনও আসল জঙ্গল ফাউল আর ফাঁদে পা দেবে না।
সূর্য পশ্চিমে ঢলে পড়েছে। টিলার চূড়া থেকেই সূর্যাস্ত দেখে তারপর বাড়ি ফিরব।
No comments:
Post a Comment