জায়গাটি নিউটাউনের মধ্যেই। আমাদের ফ্ল্যাট থেকে মেরেকেটে আড়াই কিলোমিটার উত্তর-পূবে। ধারেকাছে কোনও জনবসতি নেই। পৌঁছানোর রাস্তাটা এই একটা বিস্তীর্ণ জলা-জঙ্গলের সামনে শেষ। রাস্তা যেখানে শেষ, তারপরেই জীর্ণ খাল আড়াআড়ি ভাবে পশ্চিম থেকে উত্তরে চলে গেছে। অন্য প্রান্ত দেখা যায় না। খাল পেরোলেই বুক পর্যন্ত ঘাসে ঢাকা বিল। বিলের ওপারে সবুজ ধানের ক্ষেত।
এই জায়গায় অনেকবার গেছি। প্রথম বার একটা ধূসর রঙের পাঁচ-সাত ফুটের দাঁড়াশ সাপকে রাস্তা পার হতে দেখে নাম দিয়েছিলুম দাঁড়াশের বন। জায়গাটা যেন প্রকৃতির খুব কাছাকাছি।
দাঁড়াশের বন: নিউ টাউনের অন্দরে এক টুকরো বন্য প্রকৃতি
ছবিঃ নিউ টাউন কলকাতার আবাসন এলাকার পাশে নিচু জলাভূমি এবং সবুজ ঘাসে ঢাকা মাঠ
(১)
দাঁড়াশের বনে পৌঁছানোর রাস্তাটি দুই লেনের। রাস্তার ডান দিকে-বাঁ দিকে বাবলা, সোনাঝুরি, কুল, সিরিষ, কৃষ্ণচূড়া, রুদ্রপলাশের মতো গাছ আর ঘন কাশের জঙ্গল। ডিভাইডারে বুনোফুলে জঙ্গল। শীতের আগে নাম না জানা অনেক ফুলে জায়গাটা নিজের মতো সেজে ছিল।
রাস্তার পাশ দিয়ে ৩৩ কেভি বিদ্যুতের লাইন জলাভূমি পেরিয়ে দূরে কোথাও চলে গেছে। রাস্তাটা শেষ প্রান্তে একদিকে একফালি জমি, তার ওপাশে বড় গাছের জঙ্গল, মাঝে একটা বড় জলাশয়। উল্টো দিকে বাঁশের বেড়া দেওয়া বাগানে শীতের ফসলের চাষ।
নির্জন এই জায়গায় কেবলমাত্র দু’বারই এক চাষিকে বাগানের কাজ করতে দেখেছি। প্রথম বার চাষের কথা জিজ্ঞাসা করায় বলেছিল, বৃষ্টিতে বাঁধাকপি, ফুলকপি, ওলকপি, মূলো — সবই নষ্ট হয়েছে, আবার নতুন করে লাগানোর কাজ করছেন। দ্বিতীয় বার সেই চাষিকে মেটে কচু তুলতে দেখেছিলাম।
চিত্রঃ নিউ টাউনের স্যাটেলাইট ভিলেজে লোকাল ভেজিটেবল ফার্মিং
দাঁড়াশের বনে অনেক প্রজাপতি, ফড়িং আর পাখি। ছাতার, দোয়েল, ফিঙে, বক, শালিক, ঘুঘু, সবুজ সুইচোরা, মাছরাঙা আর পানকৌড়ি — নানান ধরনের পাখি।
(২)
দু’সপ্তাহ আগে কোনও এক রবিবার সকালে দাঁড়াশের বনে গিয়েছিলাম। প্রতিবারের মতো লিওঁ সঙ্গে ছিল। খালের ধারে উঁচু মাটির ঢিবিতে বসে নিস্তব্ধতার আঁচ নিচ্ছিলাম। লিওঁ যথারীতি বন্ধনহীন, মুক্ত। এদিক-ওদিক ঘুরে বেড়াচ্ছে। কখনও লাফিয়ে খালে নেমে সাঁতার কাটছে। আমরা পাখি আর প্রজাপতি দেখছিলাম।
বাগানের উল্টো দিকের জঙ্গলে কয়েকটি খেঁজুর গাছের গোড়ায় ঘন ঘাসের মধ্যে বড় গর্ত দেখে মনে হয়েছিল, বন্যপ্রাণীর আস্তানা। ভাম বা খটাশ হতে পারে, এমনকি শেয়ালের কথাও মনে এসেছিল।
সে সময় আমি খেঁজুর জঙ্গলের সামনে দাঁড়িয়ে পায়ের ছাপ লক্ষ্য করার চেষ্টা করছি। লিওঁ হঠাৎ জলায় নেমে সাঁতার কাটা শুরু করে। আমি দূরে কোথাও কোলাহলের শব্দ শুনতে পেলাম।
লিওঁ ঝটপট জল থেকে উঠে গা ঝাড়া দেয়। কোলাহলের শব্দ আরও স্পষ্ট হচ্ছে। আমার মনে হল, শেয়ালের ডাক। আমার বলা হয়তো শেষও হয়নি, দেখলাম চল্লিশ ফুট দূরে একটা শেয়াল রাস্তা পেরিয়ে বাগানের দিক থেকে জঙ্গলের দিকে যাচ্ছে।
আমাদের পরিবারের অন্যতম সদস্য লিওঁ — একটি ন’বছর বয়সের মেল জার্মান শেফার্ড (GSD)। এই বয়সেও ওর দৃষ্টি আর ঘ্রাণশক্তি অটুট। কোথাও ঘুরতে গেলে লিওঁ-র সঙ্গে থাকাটা মানে কিছুটা বাড়তি হুজ্জুতি আর অনেকটা বাড়তি আনন্দ।
(৩)
লিওঁ উত্তেজিত; তার থেকে আমি বেশি উত্তেজিত, কারণ লিওঁকে শেয়াল আক্রমণ করতে পারে। বোকা লিওঁ শেয়ালের দিকে তেড়ে যেতে পারে। লিওঁ নাক তুলে দূর থেকে ভেসে আসা অচেনা গন্ধ বোঝার চেষ্টা করছে।
দ্রুত গাড়িতে উঠে লিওঁর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে চাইলাম। লিওঁকে নিয়ে গাড়ির দিকে এগোতেই আরও পাঁচ-ছয়টি শেয়াল কুড়ি-পঁচিশ ফুট দূরে নিজেদের ‘গান গাইতে গাইতে’ জঙ্গলের দিকে চলে গেল।
আমরা ততক্ষণে গাড়িতে। পেছনের শেয়ালটি জঙ্গলে ঢোকার আগে খোলা জমিতে দাঁড়িয়ে আমাদের বোঝার চেষ্টা করে নিল। এত দ্রুত ঘটনা ঘটে গেল যে ছবি তোলার সুযোগ পাইনি।
ফেরার সময় মনে হচ্ছিল আর ক’দিন পরেই এই জলা-জঙ্গল ভ্যানিশ হবে। আর সে সময় দুষ্টু বালিকা, লা নিনা এই পথ দিয়েই আসবে। আমরা তার দুষ্টুমি সামলাতে অস্থির হব।
ছবিঃ নিউটাউনের মাঝেই আবাসন এলাকায় কাশের জঙ্গল
No comments:
Post a Comment