4 Dec 2025

শ্রোয়েডিঙ্গারের বেড়াল ও কোয়ান্টাম মেকানিক্স: নিশ্চিত বনাম সম্ভাবনার জগত

কোয়ান্টাম মেকানিক্সের সবচেয়ে বিখ্যাত চিন্তানিরীক্ষাগুলোর একটি হলো শ্রোয়েডিঙ্গারের বেড়াল — যেখানে একটি প্রাণী একই সঙ্গে জীবিত ও মৃত অবস্থায় থাকতে পারে বলে ধরা হয়। এই ধারণা আমাদের বাস্তবতার বোধকেই চ্যালেঞ্জ করে।

Schrödinger's famous thought experiment illustrating quantum superposition state
চিত্রঃ কোয়ান্টাম সুপারপজিশন অবস্থা ব্যাখ্যা করার জন্য শ্রোডিঙ্গারের বিখ্যাত থট এক্সপেরিমেন্ট

জীবিত ও মৃত একসঙ্গে: কীভাবে সম্ভব?

মনে করা যাক একটি এক্সপেরিমেন্টাল সেটআপে, একটি বন্ধ বাক্সের ভেতরে রাখা আছে একটি জ্যান্ত বেড়াল, একটি সায়ানাইড ক্যাপসুল, সামান্য তেজস্ক্রিয় পদার্থ এবং একটি হাতুড়ি আছে। সেটআপটি এমন ভাবে কাজ করে যে, তেজস্ক্রিয় বিকিরণ ধরা পড়লেই হাতুড়িটি সায়ানাইড ক্যাপসুলে আঘাত করবে এবং ক্যাপস্যুল ভেঙে বেরিয়ে আসবে বিষাক্ত গ্যাস, যার ফলে বেড়ালটির মৃত্যু ঘটবে। এই পরীক্ষাটি বাস্তবের নয়, এটি একটি থট এক্সপেরিমেন্ট (Thought Experiment)। নাম হল, শ্রোয়েডিঙ্গারের বেড়াল (Schrödinger's Cat)।

এই এক্সপেরিমেন্টে, বাক্স খোলার আগে, বেড়ালের যে অবস্থা তা হল একই সাথে মৃত অথবা জীবিত। অর্থাৎ, বাক্সটি খোলা না হওয়া পর্যন্ত বেড়ালটি একই সঙ্গে জীবিত ও মৃত, এই দ্বৈত অবস্থাতেই আছে। কিন্তু বাক্স খুললেই বেড়ালটিকে আমরা জীবিত অথবা মৃত এই দু’টি অবস্থার যে কোনও একটি অবস্থায় দেখতে পাব।

শ্রোয়েডিঙ্গারের বেড়াল: কেন এই থট এক্সপেরিমেন্ট?

এই থট এক্সপেরিমেন্টটি প্রস্তাব করেছিলেন অস্ট্রিয়ান পদার্থবিদ এরউইন রুডলফ জোসেফ আলেকজান্ডার শ্রোয়েডিঙ্গার। উদ্দেশ্য ছিল, অতিক্ষুদ্র কণার (Subatomic Particles) আচরণ বোঝাতে কোয়ান্টাম মেকানিক্সের অদ্ভুত ফলাফলগুলোকে বোধগম্য করে তোলা।

দৃশ্যমান জগত বনাম কোয়ান্টাম জগত

ধরা যাক, ১৬০ কিলোমিটার প্রতি ঘণ্টা বেগের ট্রেন তিন ঘন্টায় কত দূর যাবে? এমন প্রশ্নের উত্তরে কোনও সম্ভাবনা নেই, নির্দিষ্ট উত্তর আছে। এটাই চিরাচরিত বা ধ্রুপদি গতিবিদ্যা (Classical Mechanics)।

কিন্তু নিউট্রন, প্রোটন, ইলেকট্রন বা ফোটনের মতো অতিক্ষুদ্র কণার ক্ষেত্রে এই নিয়ম কাজ করে না। এদের আচরণ বোঝার জন্য দরকার এক সম্পূর্ণ ভিন্ন তত্ত্ব, কোয়ান্টাম মেকানিক্স (Quantum Mechanics)।

আলো: তরঙ্গ না কণা?

১৮০১ সালে পদার্থবিদ থমাস ইয়ং–এর ডাবল স্লিট পরীক্ষায় প্রমাণিত হয় যে আলোর মধ্যে তরঙ্গের ধর্ম রয়েছে যা, জলের ঢেউয়ের মতোই আলো পরস্পরের সঙ্গে ব্যতিচার (Interference) তৈরি করতে পারে।

থমাস ইয়াং-এর আগে আইজাক নিউটন সহ অনেকেই মনে করতেন, আলো এক ধরনের অতি সূক্ষ্ম কণার (Corpuscles) স্রোত, সরলরেখা বরাবর ছুটে যায়। ১৮৬০-এর দশকে জেমস ক্লার্ক ম্যাক্সওয়েল গাণিতিকভাবে দেখান, আলো আসলে তড়িৎচৌম্বকীয় তরঙ্গ

১৯০৫: আলোর চরিত্রে বিপ্লব

১৯০৫ সালে ফটোইলেকট্রিক (Photoelectric) প্রভাব ব্যাখ্যা করতে গিয়ে আলবার্ট আইনস্টাইন প্রমাণ করেন, আলো নির্দিষ্ট শক্তির ছোট ছোট প্যাকেটের প্রবাহ। এই শক্তির কণাগুলোকেই পরে ফোটন (photon) বলা হয়। অর্থাৎ আলোর দ্বৈত চরিত্র: কখনও কণা, কখনও তরঙ্গ।

উল্টো প্রশ্ন: কণার কি তরঙ্গ ধর্ম আছে?

১৯২৪ সালে ফরাসি বিজ্ঞানী লুই দ্য ব্রগলি প্রস্তাব করেন, যদি আলোর কণা ধর্ম থাকে, তবে কণারও তরঙ্গ ধর্ম থাকা উচিত। এখান থেকেই কোয়ান্টাম জগতের জটিলতা আরও বেড়ে যায়।

শ্রোয়েডিঙ্গারের তরঙ্গ সমীকরণ

১৯২৫ সালে শ্রোয়েডিঙ্গার কণার তরঙ্গ ধর্মকে গাণিতিকভাবে প্রকাশ করেন। জন্ম নেয় বিখ্যাত শ্রোয়েডিঙ্গার সমীকরণ। এটি একটি তরঙ্গ ফাংশন, যা কণার সব সম্ভাব্য অবস্থার তথ্য বহন করে।

ম্যাক্স বর্ন ও সম্ভাবনার জন্ম

১৯২৬ সালে জার্মান পদার্থবিদ ম্যাক্স বর্ন দেখান, শ্রোয়েডিঙ্গারের তরঙ্গ ফাংশন থেকে কোনও কণাকে কোথায় পাওয়া যেতে পারে, তার সম্ভাব্যতা নির্ণয় করা যায়।

নিশ্চিততা বনাম সম্ভাবনা: এক আশ্চর্য সংযোগ

নিশ্চিততার জগতের পথিকৃৎ স্যার আইজাক নিউটন (৪ঠা জানুয়ারি ১৬৪৩ – ৩১ মার্চ ১৭২৭)–এর জন্মদিন এবং সম্ভাবনার জগতের অন্যতম স্থপতি এরউইন শ্রোয়েডিঙ্গারের মৃত্যুদিনটি হল ৪ঠা জানুয়ারি।

শেষকথা: কোয়ান্টাম জগত কেন আমাদের ভাবনাকে নাড়া দেয়

প্রকৃতির মধ্যে যেমন নিউটনের নিশ্চিত গাণিতিক জগত, ঠিক অন্যদিকে শ্রোয়েডিঙ্গারের অনিশ্চয়তা আর সম্ভাবনার জগত, যা আমাদের চেনাজানা বাস্তবের সংজ্ঞাকেই চ্যালেঞ্জ জানায়।

১৯২৭ সালের পঞ্চম সলভয় কনফারেন্সের গ্রুপ ছবি
চিত্রঃ কোয়ান্টাম বিপ্লবের কারিগররা: ১৯২৭ সালের সলভয় কনফারেন্সে বিজ্ঞানীদের ঐতিহাসিক মহাসম্মেলন

বিজ্ঞানের আরও কিছু অবাক করা তথ্য জানতে পড়ুন: কোয়ান্টাম জগত ও অনিশ্চয়তা নীতি

No comments:

Post a Comment

Featured post

২০২৫ সালে ভারতের পুনর্নবীকরণযোগ্য শক্তি: সৌর ও বায়ুশক্তিতে রেকর্ড উৎপাদন

২০২৫ সালে ভারতের রিনিউএবল এনার্জি সেক্টর আর শুধু “অলটারনেটিভ” নয়; এখন সেটা দেশের পাওয়ার সাপ্লাই সিস্টেম-এর অন্যতম অংশীদার। সোলার, উইন্ড, ব...

পপুলার পোস্ট