সৌর বিদ্যুৎ উৎপাদনে অশনি সংকেত: প্রতি বছর ১.২১% হারে কমছে উৎপাদন ক্ষমতা!
ভারতে সৌর শক্তিকে ভবিষ্যতের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য পরিচ্ছন্ন জ্বালানি হিসেবে ধরা হচ্ছে। কিন্তু সাম্প্রতিক গবেষণা জানাচ্ছে, বাস্তবতা কিছুটা জটিল; প্রকৃতি ও দূষণের যৌথ প্রভাবে ব্যবহারযোগ্য সৌর বিকিরণ (Solar Radiation) ক্রমশ কমছে। ভারতের আবহাওয়া দপ্তর (India Meteorological Department)-এর এক সমীক্ষায় দেখা যাচ্ছে, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সৌর বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় সোলার রেডিয়েশন ধারাবাহিকভাবে হ্রাস পাচ্ছে, যার ফলে প্রতি বছর গড়ে প্রায় ১.২১ শতাংশ হারে সৌর বিদ্যুৎ উৎপাদন কমে যাচ্ছে।
ইন্ডিয়া মেটিওরোলজিক্যাল ডিপার্টমেন্টের ত্রৈমাসিক জার্নাল ‘মৌসম’ (MAUSAM)-এর এপ্রিল ২০২৪ সংখ্যায় প্রকাশিত এই গবেষণাপত্রটি ভারতের সোলার পাওয়ার ইন্ডাস্ট্রির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা।
১. গবেষণার মূল ফলাফল: আশঙ্কাজনক পতন
ভারতের আবহাওয়া দপ্তরের গবেষকরা ১৯৮৫ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখেছেন যে, ভারতে সূর্যালোকের বিকিরণ বা Global Radiation (GR) ক্রমশ কমছে। বিশেষ করে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই পতনের হার উল্লেখযোগ্যভেবে বেড়েছে:
- দ্রুত হ্রাস: ২০১৮ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে এই হ্রাসের হার দাঁড়িয়েছে প্রতি বছর ১.২১%।
- গাণিতিক চিত্র: এই কমে যাওয়ার মান প্রায় ৬.০১ W/m-2 year-1।
- বিদ্যুৎ উৎপাদনে প্রভাব: সৌর বিকিরণ ৫% কমলে সোলার ফটোভোল্টাইক সিস্টেমের বিদ্যুৎ উৎপাদনও প্রায় ৫% কমে যায়।
গবেষণাপত্রের মূল নির্যাস (Technical Insights from IMD Study)
‘মৌসম’ জার্নালে প্রকাশিত এই গবেষণাপত্রের ৯টি প্রধান তথ্য নিচে তুলে ধরা হলো:
- গ্লোবাল রেডিয়েশন (GR): উত্তর-পশ্চিম ও অভ্যন্তরীণ উপদ্বীপীয় অঞ্চলে বিকিরণ সবচেয়ে বেশি।
- সর্বত্র হ্রাস: দেশের প্রায় সব অংশেই GR কমছে।
- উপকূলীয় অঞ্চলে বিক্ষিপ্ত বিকিরণ (DR): উপকূলীয় শহরগুলোতে ডিফিউজ রেডিয়েশন বেশি।
- ডিফিউজ রেডিয়েশনের বৃদ্ধি: ৫০%-এর বেশি কেন্দ্রে DR বাড়ছে, যা দূষণ বৃদ্ধির প্রমাণ।
- ব্রাইট আওয়ার্স অফ সানশাইন (BHS): ৭৫% কেন্দ্রে উজ্জ্বল সূর্যালোক ঘণ্টা উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।
- বিপদে রাজস্থান ও গুজরাট: বড় সোলার পার্ক থাকা এলাকাগুলোতেও উৎপাদন ক্ষমতা কমছে।
- সোলার পোটেনশিয়াল (SPV): উত্তর ভারতে এটি ২০০০-এর নিচে।
- ভবিষ্যৎ ঝুঁকি: সোলার প্রজেক্টগুলো লক্ষ্যমাত্রা পূরণে ব্যর্থ হতে পারে।
- উন্নত প্রযুক্তির প্রয়োজনীয়তা: উচ্চ দক্ষতার বাইফেসিয়াল (Bifacial) মডিউল ব্যবহারের সুপারিশ।
২. কেন কমছে সূর্যালোক? (The Causes)
(১) অ্যারোসল লোড: যানবাহনের ধোঁয়া ও ধূলিকণা সূর্যের আলো শোষণ ও বিচ্ছুরিত করে সরাসরি রশ্মি কমিয়ে দেয়।
(২) ক্লাউড কভার: জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে আকাশে মেঘের স্থায়িত্ব ও ঘনত্ব বাড়ছে।
৩. উত্তরণের পথ: আমাদের করণীয় কী?
- বাইফেসিয়াল প্যানেল: বিক্ষিপ্ত আলো কাজে লাগাতে এটি অত্যন্ত কার্যকর।
- AI-চালিত ক্লিনিং: রোবোটিক সিস্টেমের মাধ্যমে ধুলো পরিষ্কার রাখা।
- দূষণ নিয়ন্ত্রণ: সোলার পলিসিকে ‘National Clean Air Programme’ (NCAP)-এর সঙ্গে যুক্ত করা।
সচরাচর জিজ্ঞাস্য প্রশ্ন (FAQ)
১. ভারতে কি সোলার প্যানেল লাগানো এখনও লাভজনক?
হ্যাঁ। বিকিরণ কিছুটা কমলেও প্যানেলের দাম হ্রাস পাওয়ায় এটি এখনও সেরা উপায়।
২. ১.২১% বিকিরণ হ্রাস মানে কি আমার প্যানেলের উৎপাদনও কমবে?
হ্যাঁ, তবে নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের মাধ্যমে এই ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়া সম্ভব।
৩. কলকাতা বা পশ্চিমবঙ্গের ওপর এর প্রভাব কেমন?
কলকাতায় হ্রাসের হার বেশি, তাই রক্ষণাবেক্ষণ ও উন্নত ইনভার্টার ব্যবহার করা জরুরি।
উপসংহার
IMD-র এই গবেষণা প্রমাণ করে, জলবায়ু পরিবর্তন এখন সোলার প্যানেলের কর্মক্ষমতার ওপর একটি বড় সীমাবদ্ধতা। তাই লক্ষ্য হওয়া উচিত শুধু প্যানেল বসানো নয়, বরং “Climate-Resilient Solar Systems” গড়ে তোলা।
No comments:
Post a Comment