5 Jul 2025

মেটিকুলাস ডিজাইন থেকে গণঅভ্যুত্থান এবং সংবিধান সংশোধনের রাজনীতি

Attack on 32 Dhanmondi, the historic residence of Bangabandhu Sheikh Mujibur Rahman in Bangladesh

বাংলাদেশ: মেটিকুলাস ডিজাইন

‘মেটিকুলাস ডিজাইনে'র মাস্টারমাইন্ড’ মাহফুজ আলম দাবি করেছেন, "(বাংলাদেশে) ক্ষমতা দখলের প্রথম পর্বটি ছিল নিখুঁতভাবে পরিকল্পিত।” তবে, পরবর্তী পর্ব অর্থাৎ রাজপথের দখল ও সহিংস গণআন্দোলনের কৃতিত্ব, তাঁর ভাষায়, “বিপ্লবী ছাত্র-জনতার।”

মাহফুজের তাত্ত্বিক গুরু ফরহাদ মজহার দু'দিন আগে বলেছেন, ক্ষমতা দখলের প্রকল্পটি সফল হলেও নতুন সংবিধান রচনার মূল লক্ষ্য ব্যর্থ হয়েছে। তাঁদের বক্তব্য থেকে স্পষ্ট হয়, ‘মেটিকুলাস ডিজাইন’ এর চারটি স্তর — ক্ষমতা দখলের প্রস্তুতি, সহিংস আন্দোলনের মাধ্যমে ক্ষমতা দখল, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠন, এবং নতুন সংবিধান রচনা।

ফরহাদের বক্তব্য অনুযায়ী, প্রথম তিনটি স্তরে যুক্তরাষ্ট্রের সহযোগিতা থাকলেও, চতুর্থ স্তরে, সংবিধান বদলের মুহূর্তে, যুক্তরাষ্ট্র ‘প্রতিবন্ধকতা’ তৈরি করে। ফলে, এই 'গণঅভ্যুত্থান' শেষপর্যন্ত অসমাপ্ত থেকে যায়।

গণঅভ্যুত্থান বনাম গণসার্বভৌমত্ব

ফরহাদ মজহার ‘জুলাই আন্দোলন’কে ‘গণঅভ্যুত্থান’ এবং সংবিধান রচনার দাবি-প্রচেষ্টাকে ‘গণসার্বভৌমত্ব’ বলে অভিহিত করেছেন। তাঁর মতে, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠন হয়ে গেলেও, একটি পূর্ণাঙ্গ রেজিম-চেঞ্জ সম্পন্ন হয়নি। কারণ, সেই সরকার ছিল সীমিত ক্ষমতার, এবং বিচারিক দায়মুক্তি বা সংবিধান পরিবর্তনের মতো গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নিতে পারেনি।

মাহফুজ আলম গত ফেব্রুয়ারিতে একই কথা বলেছেন, “..... শেখ মুজিবের তৈরি করা দূষণ থেকে আমাদের তরুণ সমাজ মুক্ত হয়েছে। অভ্যুত্থান হয়তো বিপ্লবে পরিণত হয় নাই। সামষ্টিক রূপান্তর ঘটে নাই। আমরা সেই অভ্যুত্থান পর্বের ভেতরেই আছি।”

এই পরিপ্রেক্ষিতে ১৬ জুলাই থেকে ৮ আগস্টের মধ্যে সংঘটিত পুলিশ হত্যা ও অন্যান্য রাষ্ট্রবিরোধী অপরাধকে বিচারের আওতার বাইরে রাখতে ইনডেমনিটি জারি করা হয়। এটি বাংলাদেশের ইতিহাসে নতুন কিছু নয় — বঙ্গবন্ধু হত্যার পর খন্দকার মোশতাকও ঘাতকদের ইনডেমনিটি দিয়েছিলেন।

ইনডেমনিটির পেছনে নতুন সংবিধানের কৌশল

জুলাই আন্দোলনের নেতৃত্ব জানে ইনডেমনিটি সাময়িক। তাই তারা বিচার এড়ানোর দীর্ঘমেয়াদি উপায় হিসেবে ‘নতুন সংবিধান রচনার’ কথা বলছে। গণপরিষদের নির্বাচন ও নতুন সংবিধান রচনার পেছনে মূলত বিচারের দায় এড়ানোই তাদের গোপন অভিসন্ধি।

অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রকৃত নিয়ন্ত্রক কারা?

বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রকৃত চালিকা শক্তি: জামায়াত-শিবির, হেফাজতের একটি অংশ, কিছু উগ্র ইসলামপন্থী দল, এবং ছাত্রদের একটি অংশ নতুন জাতীয় নাগরিক পার্টি।

তবে এই সরকারকে সুফি, তরিকতপন্থী ও সুন্নি ধারার ইসলামি গোষ্ঠীগুলো এবং তাবলিগ জামাতের একটি বড় অংশ সমর্থন করেনি বলেই মনে হয়।

বিএনপি এবং রাজনৈতিক সমীকরণ

বিএনপি ক্ষমতায় যেতে চায়, কিন্তু দেশের ৪০-৪৫% মানুষের আওয়ামী লীগের প্রতি সমর্থনের বাস্তবতা নিয়ে তারা নীরব। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অধীনে কোনো নির্বাচনে আওয়ামী লীগ অংশ না নিলেও, নির্বাচন বৈধতা পাবে কি না — তা নিয়ে প্রশ্ন থাকবেই।

প্রতিবেশী ভারতসহ আন্তর্জাতিক মহল মনে করে বাংলাদেশে ‘অন্তর্ভুক্তিমূলক’ নির্বাচন হওয়া বাঞ্ছনীয়। এই অন্তর্ভুক্তিমূলক শব্দটিকে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার যেভাবে ব্যাখ্যা করেছে তা কতটা গ্রহণযোগ্য, তাতে সন্দেহের অবকাশ আছে।

মুক্তিযুদ্ধ ও সংবিধান অস্বীকারের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ

জুলাই আন্দোলনের পর ছাত্রদের একটি বড় অংশ ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ অস্বীকার করে সংবিধান বাতিলের দাবি তোলে। এই দাবিগুলো ব্যাপক প্রতিক্রিয়া ও প্রতিবাদের মুখে পড়ে। জীবিত কিংবদন্তি মুক্তিযোদ্ধারা — জনাব ফজলুর রহমান, এম এ আজিজ, মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম, কাদের সিদ্দিকী, লতিফ সিদ্দিকী, ড. কামাল হোসেন, জেড আই খান পান্না, মাহমুদুর রহমান মান্না, মোস্তফা মোহসীন মন্টু (সদ্য প্রয়াত), আখতারুজ্জামান রঞ্জন প্রমুখ বিভিন্ন মতাদর্শে বিভক্ত হলেও তারা ঐক্যবদ্ধ। তাঁরা মুক্তিযুদ্ধ, বঙ্গবন্ধুর অবদান ও রাষ্ট্রবিরোধী ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে সরব।

শেষ প্রশ্ন: আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করে কি শান্তি আসবে?

বর্তমান সরকারবিরোধী বিভিন্ন রাজনৈতিক দল মনে করে আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করলেই দেশে স্থিতি আসবে। কিন্তু বাস্তবতা হলো — ৩৫-৪০% মানুষের সমর্থন আওয়ামী লীগের প্রতি এখনও অটুট। ফলে, এমন একটি দলের ‘কাজকর্ম বাতিল’ করে বাংলাদেশে স্থিতি ফিরবে কি না — এই প্রশ্নটি বেশ গুরুত্বপূর্ণ।

No comments:

Post a Comment

Featured post

২০২৫ সালে ভারতের পুনর্নবীকরণযোগ্য শক্তি: সৌর ও বায়ুশক্তিতে রেকর্ড উৎপাদন

২০২৫ সালে ভারতের রিনিউএবল এনার্জি সেক্টর আর শুধু “অলটারনেটিভ” নয়; এখন সেটা দেশের পাওয়ার সাপ্লাই সিস্টেম-এর অন্যতম অংশীদার। সোলার, উইন্ড, ব...

পপুলার পোস্ট