ভূমিকা
চিলির রাজনৈতিক ডামাডোলে এক কবির জীবন যখন সংকটাপন্ন, তখন কলম ফেলে তাকে হাতে তুলে নিতে হয়েছিল ঘোড়ার লাগাম। পাবলো নেরুদার আন্দিজ পর্বত পার হওয়ার সেই অবিশ্বাস্য কাহিনী আজও আমাদের রোমাঞ্চিত করে। আজ এই মহান কবির জন্মবার্ষিকীতে ফিরে দেখা যাক তাঁর সেই পলায়ন পর্ব।
নেরুদার সেই ঐতিহাসিক দিনলিপি
১. ডামিয়েন ল এবং গ্রেপ্তারি পরোয়ানা (১৯৪৮)
৬ই জানুয়ারি ১৯৪৮। চিলির তৎকালীন রাষ্ট্রপতি "ডামিয়েন ল" জারি করে কমিউনিস্টদের নিষিদ্ধ ও রাষ্ট্রদ্রোহী ঘোষণা করেন। সেনেটর ও কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য পাবলো নেরুদার বিরুদ্ধে ৩ ফেব্রুয়ারি গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হয়। ৪৪ বছর বয়সী কবিকে আত্মগোপন করতে হয় সান্তিয়াগোর এক গোপন অ্যাপার্টমেন্টে।
২. ছদ্মবেশে মিগেল ওয়াসকেজ
৮ই ফেব্রুয়ারি ভোরে খবর আসে পুলিশ হানা দেবে। নেরুদা দ্রুত দেশ ছাড়ার সিদ্ধান্ত নেন। তাঁর বন্ধু নাট্য পরিচালক ভিক্টর পেইরা তাঁকে ছদ্মবেশ দিলেন—ছেঁড়া জামা, মোটা চশমা আর হাতে বইয়ের বান্ডিল। নেরুদা হয়ে গেলেন চোখের সমস্যায় আক্রান্ত স্কুলশিক্ষক "মিগেল ওয়াসকেজ"।
৩. ট্রেনের সেই শ্বাসরুদ্ধকর যাত্রা
৯ই ফেব্রুয়ারি নজর এড়াতে ভিড়ে ঠাসা রেলে চাপলেন কবি। পুলিশের কড়া তল্লাশি চললেও কেউ চিনতে পারল না ছদ্মবেশী নেরুদাকে। কিন্তু ১১:২০ মিনিটে বালপারাইসো স্টেশনে নামতেই সামনে এসে দাঁড়ালেন পুলিশ অফিসার জোসে বোরগোনিও।
৪. পুলিশের কবিতা প্রেম
গ্রেপ্তার হওয়ার বদলে নেরুদা এক পরম বিস্ময়ের মুখোমুখি হলেন। অফিসার বোরগোনিও কানে কানে বললেন, "স্যার, আপনার প্রতিটি কবিতার লাইন আমার হৃদয়ে গাঁথা..."। তিনি গ্রেপ্তার না করে নিজের গাড়িতে করে নেরুদাকে গোপন আশ্রয় 'লা চাসকোনা'-তে পৌঁছে দিলেন।
৫. লা চাসকোনার গোপন ট্র্যাপডোর
রান্নাঘরের মেঝের গোপন দরজা দিয়ে নেরুদাকে ঢুকতে হতো এক অন্ধকার ঘরে। সেখানে একটি কেরোসিন ল্যাম্প আর টাইপরাইটারই ছিল তাঁর সঙ্গী। স্থানীয় তরুণী কেরোলোসা গোপনে খাবার ও খবরের জোগান দিতেন।
৬. আন্দিজ জয়ের সংকল্প (১৯৪৯)
নেরুদা সিদ্ধান্ত নিলেন বরফে ঢাকা আন্দিজ পর্বত পার হয়ে আর্জেন্টিনায় যাবেন। ২৪ মার্চ ১৯৪৯, ভোর ৪টা। কেরোলোসার স্বামী ভিক্টর বিয়ানি দুটি ঘোড়া নিয়ে হাজির হলেন। নেরুদার ঘোড়ার নাম 'ব্লাঙ্কিতো' আর ভিক্টরের 'নেভাদো'। ৩,০০০ মিটার উচ্চতায় যাত্রা শুরু হলো।
৭. মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে আসা
২৫ মার্চ দুপুরে ৪,২০০ মিটার উচ্চতায় 'লা গার্ডা' হিমবাহে ব্লাঙ্কিতোর পা পিছলে যায়। নেরুদা অতল খাদের দিকে ঢলে পড়লেও ভিক্টরের ক্ষিপ্রতায় প্রাণে বেঁচে যান। ২৭ মার্চ তারা পৌঁছান আর্জেন্টিনার সান কার্লোস ডে ব্যারিলোচে শহরে। ঠান্ডায় জমে যাওয়া নেরুদাকে জড়িয়ে ধরে বন্ধু রাউল গঞ্জালেস বলেন, "গোটা লাতিন আমেরিকা তোমাকে খুঁজছে, পাবলো!"
৮. ফেরা ও উত্তরসূরি
১৯৫২ সালে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা বাতিল হলে নেরুদা বীরের বেশে চিলিতে ফেরেন। আজ চিলির রাজনীতি অনেক বদলেছে। বর্তমান রাষ্ট্রপতি গ্যাব্রিয়েল বোরিক একজন সমাজতন্ত্রী এবং কমিউনিস্ট নেতা জেনাট জারা ভবিষ্যতের পথে এগিয়ে আছেন।
৯. শেষ কথা
নেরুদা লিখেছিলেন, “আমার পলায়ন কোনো দুঃসাহসিক অভিযান ছিল না... তা ছিল চিলির মাটির ভালোবাসার জন্য যাত্রা।” রিকার্দো এলিসের নেফতালি রেয়েস বাসোয়ালতো ওরফে পাবলো নেরুদা আজও তাঁর কবিতার মধ্য দিয়ে আমাদের মাঝে বেঁচে আছেন।
No comments:
Post a Comment