12 Jul 2025

ইরাবতী: ইরাদি ও একটি অপূর্ণ চাঁদের দেশের গল্প

ইরাবতী: এক হারিয়ে যাওয়া রূপকথার দিদি

ইরা’দির ভালো নাম ছিল ইয়াসমিন সুলতানা ইরা। বন্ধুদের কাছে সে শুধুই ইরা। কিন্তু আমি তাকে একটা নাম দিয়েছিলাম, 'ইরাবতী'। এই নামের সাথে কখনও 'দিদি' যোগ করে ডাকিনি, কারণ ওই নামটা ছিল শুধু আমার দেওয়া।

সেই প্রথম দেখা: সন্তু না অংশু?

প্রথম দেখা এক বাসস্ট্যান্ডে, ফুচকার লাইনে দাঁড়িয়ে। দূরে দেখি একদল মেয়ে, তাদের মধ্যে কেউ একজন অভিভাবকের মতো সবাইকে ধমক দিচ্ছে, আবার পরক্ষণেই হাসতে হাসতে গড়িয়ে পড়ছে। সেই আমার প্রথম দেখা ইরাদির সাথে।

হঠাৎ আমাকে দেখে সে বলে উঠল, "সন্তু, তুই এখানে কেন রে!" আমি ঘাবড়ে গিয়ে কোনোমতে বললাম, "আমি মানে, অং…"। "বুঝেছি, বুঝেছি। পাকামি করিস না। অং বং করিস না। কী খাবি? ফুচকা না কুড়মুড়ে?"

আমি ফের শুধরে দেওয়ার চেষ্টা করলাম, "না, মানে আমি সন্তু না, অংশু।" ইরাদি বলেছিল, "ঐ হয়েছে, যে সন্তু সেই অংশু।" সেই থেকে একজনের কাছে আমার নাম পাকাপাকিভাবে পাল্টে গেল, 'সন্তু'। বিনিময়ে আমিও তার নাম পাল্টে দিলাম, ইরাবতী। অনেক পরে বুঝেছিলাম, সন্তু-টন্তু বলে পরিচিত কেউ ছিল না; খানিকটা দিদিগিরি করার জন্য আমার মতো একটা 'পিস' নাকি ইরাদি অনেক দিন ধরেই খুঁজছিল।

The half-moon visible through the green leaves of a Bottle Palm tree in a quiet evening

ছবিঃ বোতল পাম গাছের পাতার আড়ালে লুকানো একফালি চাঁদ

অত্যাচার ও কবিরাজি বিকেলের গল্প

ইরাদির অত্যাচার ছিল দেখার মতো, কিন্তু আখেরে তাতে আমার লাভ ছাড়া ক্ষতি হয়নি। কোনোদিন কলেজ স্ট্রিট যাওয়ার নাম করে বাড়িতে ডেকে, ভালোমন্দ খাইয়ে হঠাৎ বলত, "না রে অংশু, আজ কলেজ স্ট্রিটের মুড নেই, চল নাটক দেখে আসি।"

সে সময় মোবাইল ছিল না। বাড়িওয়ালাকে ফোন দিয়ে আমায় ডেকে পাঠিয়ে কতদিন অকারণে বকাঝকা করে শেষে হয়তো বলল, "উফ্ তোকে যে কেন ফোন করেছি তা ভুলেই গেছি। রাগ করিস না। কাল কবিরাজি খাওয়াব।"

ওর বাবা, বদরুল চাচা; কাঠখোট্টা মানুষ হলেও মেয়ের জন্য প্রাণ দিয়ে দিতেন। মা-হারা একমাত্র মেয়ের সব আবদার মেনে নিতেন, ঝগড়া করতেন, কিন্তু রোজ রাতে বারান্দায় বসে মেয়ের চিন্তায় মগ্ন থাকতেন।

সেই রহস্যময় অন্তর্ধান

ইরাদি প্রায়ই বলত, "একদিন এমন উধাও হব যে টেরও পাবি না।" "কোথায় যাবে, ইরাদি?" "জানলে তো পিছু নিবি। বলব না।"

এক শনিবার সত্যিই সে হারিয়ে গেল। সকালে বেরিয়েছিল, সন্ধ্যা পর্যন্ত ফেরেনি। বন্ধুদের বাড়ি খুঁজেও কোনো হদিস মেলেনি। রবিবার সকালে ডাক পড়ল। গিয়ে দেখি, চোখে ক্লান্তি কিন্তু মুখে এক ধরনের তৃপ্তি। বলল, "গতকাল একটা বাড়িতে ১২ ঘণ্টা কাজ করেছি। এক অসুস্থ মানুষকে সেবা দিয়ে ২০০ টাকা পেয়েছি। নিজের রোজগারের মেহনত পরখ করলাম।" দুপুরে খাওয়ার পর আমার হাতে সেই টাকাটা গুঁজে দিয়ে বলল, "নে... তুই খরচ করিস।"

চাঁদের দেশের ডাক

একবার ইরাদি খুব অসুস্থ। জ্বরের ঘোরে বিছানায় শুয়ে হঠাৎ বলল, "একটা গল্প শোনাব?" আমি বললাম, "তুমি এখন চুপ করে থাকো।" তবু সে বলে যায়, "জানিস, আমার মা বলত, একদিন আমাকে চাঁদে নিয়ে যাবে। তার মা-ও নাকি তাকে একই কথা বলেছিল। তুই নিয়ে যাবি আমাকে চাঁদে?"

আমি কী বলেছিলাম, আজ আর মনে নেই।

শেষ কথা

ইরাবতী চলে গেছে বহুদিন। অসুখটা এমন ছিল যে ফেরার পথ রাখেনি। আজ যখন ইরাদির বাড়ির সামনে দিয়ে যাই, দোতলার বারান্দার দিকে তাকালে মনে হয় এই বুঝি ওকে দেখা যাবে। হয়তো এখনও অপেক্ষা করছে; "সন্তু, তুই এত দেরি করলি কেন রে?"

ইচ্ছে করে বলি, "ইরাদি, চল চাঁদের দেশ থেকে ঘুরে আসি।" পরক্ষণেই মনে হয়, ধ্যাৎ, চাঁদ তো একটা রুক্ষ, জলাবাতাসহীন, নিষ্প্রাণ উপগ্রহ। সেখানে কি কেউ থাকে নাকি! কিন্তু ইরাবতীরা বোধহয় ওখানেই ভালো থাকে।

আমাদের ব্লগ পরিবার আজ ২৬০০ সদস্য পার করল। আজই ১০০-র বেশি মানুষ এই ব্লগে সময় কাটিয়েছেন। আপনাদের এই ভালোবাসাই আমার এগিয়ে চলার প্রেরণা।

No comments:

Post a Comment

Featured post

২০২৫ সালে ভারতের পুনর্নবীকরণযোগ্য শক্তি: সৌর ও বায়ুশক্তিতে রেকর্ড উৎপাদন

২০২৫ সালে ভারতের রিনিউএবল এনার্জি সেক্টর আর শুধু “অলটারনেটিভ” নয়; এখন সেটা দেশের পাওয়ার সাপ্লাই সিস্টেম-এর অন্যতম অংশীদার। সোলার, উইন্ড, ব...

পপুলার পোস্ট