তুমি এসে বসবে বারে বারে
লাহোরের পুরনো শহর, আন্দ্রুন লাহোর। অলিগলির জ্যান্ত ইতিহাস। পাকিস্তানি বন্ধু শাদমানের সঙ্গে হাঁটছি সাবেল ওয়ালী গলির পিচঢালা রাস্তায়। রাতের অন্ধকারে আলো-আঁধারির খেলা—এলাকাটা যেন লেনিন সরণির ছোটভাই, এক অনন্য ছন্দে এই রাতে স্পন্দিত হচ্ছে।
গলির বাঁকে ভেসে আসছে ব্যাঞ্জোর টুং-টাং সুর। মিহি, করুণ, গজলের তানে মিশে আছে অবোধ্য ভাষার গুঞ্জন। শাদমান অর্ধেক ইংরেজি বাকি অর্ধেক হিন্দি উর্দু মিশিয়ে যা বলল তাতে বুঝলাম "মস্তিই-রুহানি সে ভর দে মাহি"… ওই টিনশেডের নিচে দেখো! আলোর রেখায় ধরা পড়ল এক চিলতে বারান্দা। এক বুড়ো তাঁর দশ আঙুলের মরমি স্পর্শ দিয়ে ব্যাঞ্জোতে সুর তুলছেন।
দাঁড়িয়ে পড়লাম আমরা। বুড়ো আলতো হাসল, মাথা নাড়ল, আবার সুরে মগ্ন। শাদমান ফিসফিস করে পড়ল, "ইশক কা সফর হ্যায়, ওহি তো হ্যায় দাস্তান"… কথাগুলো নিজের মতো করে বুঝলাম—ভালোবাসার যাত্রা অন্তহীন, মানবতা তার চিরন্তন গন্তব্য।
হিমেল হাওয়ায় গলির বাতি দুলছে। আকাশে ঝকঝকে তারারা মিটমিট করে লুকোচুরি খেলছে। ফুটপাথে সুগন্ধি মশলা, লাহোরি কাবাবের সুবাস, কয়লার ধোঁয়ায় মিশে মনমাতানো গন্ধ। শাদমান ক্যাপস্টান সিগারেটের ধোঁয়া উড়িয়ে বলল, “সুফি সুর কখনো মরে না… দেখো, গলির কুকুরটাও শুনছে!”
গলির নাম ছিল ‘গলি-ই-খামোশ’—নিঃশব্দের গলি। এখন ডাকে ‘সিক্সার মার্কেট’। কিন্তু এখানকার সুর এখনও সেই পুরনো খামোশিরই প্রতিধ্বনি। হাঁটতে হাঁটতে ব্যাঞ্জোর সুর পিছু নিল, গজলের লাইন কানে বাজতে লাগল—"ইশক কি ইনতি নেহি, ইশক হ্যায় ইনসানিয়াত"…
রাস্তার ধারে রবি ঠাকুরের সেই গানের কথা মনে হলো—"গানের সুরের আসনখানি পাতি পথের ধারে…"। গলি-ই-খামোশের বুড়ো ব্যাঞ্জো বাদক যেন সেই আসন পেতে বসে আছে। পথিকেরা আসে, যায়—সুরের পরিবর্তন নেই।
ব্যাঞ্জোর টুং-টাং সুরে ভেসে চললাম আমরা—একটি রাত, দুই পথিক, আর এক টিনশেডের নিচে অমর সুফি সুরের নদী।
No comments:
Post a Comment