মহাবিস্ফোরণ থেকে নীল গ্রহ: সৃষ্টির এক বিস্ময়কর মহাকাব্য
‘বিগ ব্যাং’ থিয়োরি বা বাংলায় ‘মহাবিস্ফোরণ’ তত্ত্ব আমাদের এই মহাবিশ্ব সৃষ্টির একটি গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা। দমদমে সকেট বোমা ফাটলে বা বীরভূমের গ্রামে গ্রামে মাইক্রো বিস্ফোরণ হলে তার কারণ স্পষ্ট, কিন্তু কেন এই মহাবিস্ফোরণ ঘটল - তার ব্যাখ্যা এখনও পরিষ্কার নয়।
১. সেই আদি বিন্দু: পয়েন্ট অফ সিংগুলারিটি
প্রায় ১৩৭০ ± ২০ কোটি বছর আগে মহাবিশ্ব সৃষ্টির সময় থেকেই এর আকার ক্রমশ প্রসারিত হচ্ছে এবং ঘনত্ব কমছে। বর্তমানে এই প্রসারণের হার প্রতি মিনিটে প্রায় এক লক্ষ কোটি আলোকবর্ষ। ফলে সময়কে উল্টোদিকে নিয়ে গেলে এমন এক মুহূর্ত পাওয়া যাবে, যখন মহাবিশ্ব ছিল শূন্য আকৃতির, অসীম ভর ও ঘনত্ব বিশিষ্ট একটি ‘বিন্দু’, যাকে বলা হয় পয়েন্ট অফ সিংগুলারিটি।
২. ক্ষুদ্রতম জগত ও প্ল্যাঙ্ক সময়
খুব ছোট সময় বা বস্তুর ক্ষেত্রে আমরা সাধারণভাবে যেভাবে নিউটনীয় নিয়ম বুঝি, তা খাটে না। এই স্তরে কোয়ান্টাম জগতের মাপজোক করা হয় প্ল্যাঙ্ক সময় ও প্ল্যাঙ্ক দৈর্ঘ্য দিয়ে।
এক প্ল্যাঙ্ক সময় এতটাই ক্ষুদ্র যে তাকে আর ভাঙা যায় না। এক সেকেন্ডকে একের পরে ৪৪টি শূন্য বসিয়ে ভাগ করলে যে সময় পাওয়া যায়; সেটাই প্রায় এক প্ল্যাঙ্ক সময়।
৩. সৃষ্টির প্রথম কয়েক সেকেন্ড
মহাবিস্ফোরণের পর প্রথম ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র সময়কালে কী ঘটেছিল তা পুরোপুরি জানা না গেলেও তখন মহাবিশ্বের ঘনত্ব ছিল প্রায় একের পরে ৯০টি শূন্য বসানো সংখ্যার সমান (কেজি প্রতি ঘন সেন্টিমিটার) এবং তাপমাত্রা ছিল একের পরে ৩২টি শূন্য বসানো সংখ্যার মতো কেলভিন।
প্রথম এক সেকেন্ডের পর তাপমাত্রা কমে প্রায় একশ কোটি ডিগ্রি সেলসিয়াসে নামে এবং প্রসারণ হয় একের পরে ৫০টি শূন্য বসানো সংখ্যার মতো গুণে। তখনো কোনও চেনা কণা ছিল না। এক সেকেন্ড পরে কোয়ার্ক, ইলেকট্রন, প্রোটন ও নিউট্রনের মতো মৌলিক কণিকা তৈরি হয়। তিন সেকেন্ড পরে প্রোটন ও নিউট্রন মিলিত হয়ে নিউক্লিয়াস গঠন করে এবং পরে তৈরি হয় হাইড্রোজেন, হিলিয়াম ও লিথিয়ামের মতো পরমাণু। মহাবিস্ফোরণের কয়েক লক্ষ বছর পর্যন্ত আমরা যাকে জড়পদার্থ বলি, তা তৈরি হয়নি।
৪. অন্ধকারের অবসান ও প্রাণের উদ্ভব
মহাবিস্ফোরণের প্রায় চার লক্ষ বছর পরে তাপমাত্রা কমে প্রায় ৩০০০ কেলভিনে নেমে আসে। তখনই স্থায়ী পরমাণু গঠনের উপযোগী পরিবেশ তৈরি হয়। এই সময় মহাবিশ্বে ফোটনের চলাচলের পথ খুলে যায় এবং তেজস্ক্রিয় বিকিরণ ও জড়পদার্থের আধিপত্য শুরু হয়।
- ছায়াপথ তৈরি: বিস্ফোরণের প্রায় ১০০ কোটি বছর পরে।
- সূর্যের জন্ম: আজ থেকে প্রায় ৫০০ কোটি বছর আগে।
- পৃথিবীর জন্ম: প্রায় ৪৫০–৪৬০ কোটি বছর আগে।
- প্রাণের স্পন্দন: এই নীল গ্রহে প্রাণের উদ্ভব হয়েছে প্রায় ৩০০ কোটি বছর আগে।
শেষ কথা
মহাবিশ্বের এই বিশালতা আর আমাদের অস্তিত্বের ক্ষুদ্রতা নিয়ে ভাবলে রবীন্দ্রনাথের সেই অমোঘ বাণীই মনে পড়ে -
“মহাবিশ্বে মহাকাশে মহাকাল-মাঝ / আমি মানব একাকী ভ্রমি বিস্ময়ে, ভ্রমি বিস্ময়ে॥”
Excellent
ReplyDeleteExcellent
ReplyDeleteExcellent
ReplyDeleteexcellent
ReplyDelete