11 Dec 2025

নিউক্লিয়ার ফিউশন থেকে সোলার ইলেকট্রিসিটি: সব শক্তির উৎসই কি সূর্য?

আমাদের পৃথিবীর সমস্ত শক্তির আধার কি সত্যিই সূর্য? নিউক্লিয়ার ফিউশন থেকে শুরু করে সৌর বিদ্যুৎ কীভাবে এই শক্তির রুপান্তর ঘটে, তা নিয়ে আজকের আলোচনা।

High mast street light powered by grid electricity, derived from solar energy

চিত্রঃ গোয়ালপোখর ব্লকে হাই মাস্ট লাইটিং সিস্টেম

সূর্য: সকল শক্তির উৎস

সূর্য যে বিপুল শক্তি বিকিরণ করে, তার মূল কারণ হলো তার কেন্দ্রে ক্রমাগত ঘটে চলা নিউক্লিয়ার ফিউশন (Nuclear Fusion) প্রক্রিয়া। সূর্যের কেন্দ্রে অত্যন্ত উচ্চ তাপমাত্রা ও চাপের ফলে হাইড্রোজেন পরমাণুর নিউক্লিয়াসগুলি যুক্ত হয়ে হিলিয়াম নিউক্লিয়াস তৈরি করে। এটি ঠিক সেই পদ্ধতি যার মাধ্যমে নক্ষত্ররা কোটি কোটি বছর ধরে আলো দিয়ে আসছে।

এই ফিউশন প্রক্রিয়ায় উৎপন্ন হিলিয়াম নিউক্লিয়াসের ভর বিক্রিয়াকারী চারটি হাইড্রোজেন নিউক্লিয়াসের মোট ভরের তুলনায় সামান্য কম হয়। এই ভরঘাটতি শক্তিতে রূপান্তরিত হয়। সেই বিপুল শক্তির একটি ক্ষুদ্র অংশ সৌরশক্তি হিসেবে পৃথিবীতে এসে পৌঁছায়।

সূর্যের কেন্দ্রে তাপমাত্রা প্রায় ১.৫ কোটি ডিগ্রি সেলসিয়াস এবং চাপ পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের চাপের প্রায় ২৬,৫০০ কোটি গুণ। এত তাপ ও চাপ থাকা সত্ত্বেও হাইড্রোজেন নিউক্লিয়াসগুলিকে একত্রিত হতে কেবলমাত্র তাপই যথেষ্ট নয়।

উচ্চ তাপমাত্রার কারণে হাইড্রোজেন নিউক্লিয়াসগুলি অত্যন্ত দ্রুতগতিতে চলাচল করে এবং ধনাত্মক আধান থাকার কারণে তাদের মধ্যে কুলম্ব বিকর্ষণ বল কাজ করে, যা প্রোটনগুলিকে কাছে আসতে বাধা দেয়।

ক্লাসিক্যাল বলবিদ্যা অনুযায়ী নিউক্লিয়ার ফিউশন ঘটার জন্য প্রয়োজনীয় তাপমাত্রা প্রায় ১০০ কোটি ডিগ্রি সেলসিয়াস হওয়া উচিত। কিন্তু বাস্তবে সূর্যের কেন্দ্রে তাপমাত্রা মাত্র ১৫ কোটি ডিগ্রি সেলসিয়াস হয়। তবুও ফিউশন সম্ভব হয়; এটি কোয়ান্টাম বলবিদ্যার কোয়ান্টাম টানেলিং (Quantum Tunneling) প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ব্যাখ্যা করা যায়।

কোয়ান্টাম টানেলিং এমন একটি প্রক্রিয়া যেখানে প্রোটনের মতো কণা পর্যাপ্ত গতিশক্তি না থাকা সত্ত্বেও কুলম্ব বিকর্ষণ বলের সম্ভাব্য বাধা অতিক্রম করে একে অপরের কাছে পৌঁছাতে সক্ষম হয়। এই ক্ষুদ্র সম্ভাবনা হলেও সূর্যের কেন্দ্রে অসংখ্য প্রোটনের মধ্যে প্রতি মুহূর্তে বিপুল পরিমাণ ফিউশন ঘটে এবং শক্তি উৎপন্ন হয়।

সূর্য প্রতি সেকেন্ডে প্রায় ৩৮৪,৬০০,০০০,০০০,০০০,০০০,০০০,০০০ মেগাওয়াট শক্তি বিকিরণ করে। এর মাত্র প্রায় ০.০০০০০০০৪৫% পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে এসে পৌঁছায়। প্রতি বর্গমিটারে যে শক্তি পৌঁছায় তাকে সোলার কনস্ট্যান্ট বলা হয় — এর গড় মান প্রায় ১৩৬০ ওয়াট/মি²

এই সৌরশক্তির প্রায় ৩০% প্রতিফলিত হয়ে মহাশূন্যে ফিরে যায় এবং বাকি ৭০% বায়ুমণ্ডল, মেঘ ও ভূপৃষ্ঠ দ্বারা শোষিত হয় — এটাই পৃথিবীর প্রায় সমস্ত শক্তির মূল উৎস।

মানুষসহ পৃথিবীর প্রায় সব প্রাণী ও উদ্ভিদ সূর্যের ওপর নির্ভরশীল। আমরা শুধু আলো ও তাপই পাই না, বরং বিভিন্ন পদ্ধতিতে সূর্যের শক্তিকে ব্যবহারযোগ্য শক্তিতে রূপান্তরিত করি।

জীবাশ্ম জ্বালানি: লক্ষ লক্ষ বছরের সঞ্চিত সৌরশক্তি

কয়লা, পেট্রোল ও ডিজেল প্রভৃতি জীবাশ্ম জ্বালানি মূলত লক্ষ লক্ষ বছর ধরে সঞ্চিত সৌরশক্তিরই রূপ। অতীতে উদ্ভিদ ও শৈবাল সালোকসংশ্লেষের মাধ্যমে সূর্যের আলো শোষণ করে তা রাসায়নিক শক্তি হিসেবে দেহে সঞ্চয় করত। পরে এই জৈব পদার্থগুলি মাটির গভীরে চাপা পড়ে প্রচণ্ড চাপ ও তাপে কয়লা বা পেট্রোলিয়ামে রূপান্তরিত হয়েছে।

এই জ্বালানির দহন মানে হলো সেই পুরোনো রাসায়নিক বন্ধনগুলি ভেঙে বহু বছরের সঞ্চিত সৌরশক্তিকে পুনরুদ্ধার করা। তবে যেহেতু কয়লা, খনিজ গ্যাস ও পেট্রোলিয়াম তৈরিতে লক্ষ লক্ষ বছর সময় লাগে, তাই এগুলি পুনর্নবীকরণযোগ্য নয়

বায়োমাস: আজকের দিনে রূপান্তরিত সৌরশক্তি

কাঠ, ফসলের অবশিষ্টাংশ ইত্যাদি বায়োমাস মূলত সৌরশক্তি থেকেই উৎপন্ন। উদ্ভিদ সালোকসংশ্লেষের মাধ্যমে আলোকে রাসায়নিক শক্তিতে রূপান্তরিত করে, যা পরে পুড়িয়ে তাপ বা বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হয়। প্রাণীর বর্জ্য থেকে অ্যানেরোবিক ডাইজেশন প্রক্রিয়ায় উৎপন্ন বায়োগ্যাসও বায়োমাস-উৎপন্ন সৌরশক্তিরই একটি রূপ।

বায়ুশক্তি: সূর্যের তাপে সৃষ্ট বায়ুপ্রবাহ

সূর্যের তাপে পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানে তাপমাত্রার ভিন্নতা তৈরি হয়। উষ্ণ বাতাস উপরে উঠে গেলে ঠান্ডা উচ্চচাপের বাতাস সেই স্থান পূরণের জন্য দ্রুত ছুটে আসে — এভাবেই বায়ুপ্রবাহ তৈরি হয়। পৃথিবীর ঘূর্ণন (Coriolis Effect) এই প্রবাহকে আরও প্রভাবিত করে।

প্রাচীন যুগ থেকে আধুনিক উইন্ড টারবাইন পর্যন্ত, বায়ুশক্তি মানুষের অন্যতম নির্ভরযোগ্য পুনর্নবীকরণযোগ্য শক্তির উৎস।

জলবিদ্যুৎ: সূর্যের শক্তি থেকে উৎপন্ন

সূর্যের তাপে জল বাষ্পীভূত হয়ে মেঘ তৈরি করে এবং বৃষ্টিপাত ঘটায়। এই জল আবার নদী ও জলাশয়ে ফিরে এসে প্রবাহ সৃষ্টি করে। বাঁধ নির্মাণ করে সেই জলের স্থিতিশক্তিকে টারবাইন ঘুরিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যবহৃত হয়। জলবিদ্যুৎও মূলত সূর্যের ওপর নির্ভরশীল।

ফোটোভোল্টাইক (Photovoltaic) প্রযুক্তি: আলো থেকে সরাসরি বিদ্যুৎ

ফোটোভোল্টাইক বা পিভি প্রযুক্তি বিশ্বজুড়ে নির্ভরযোগ্য ও পরিবেশবান্ধব বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে। এই প্রযুক্তিতে সূর্যের আলো সরাসরি বিদ্যুৎ শক্তিতে রূপান্তরিত হয়।

ঘূর্ণমান অংশ না থাকার কারণে এটি শব্দহীন, দূষণহীন এবং রক্ষণাবেক্ষণ কম। সিলিকনসহ সেমিকন্ডাক্টর উপকরণ দিয়ে তৈরি ফটোভোল্টাইক সেল শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদনেই নয়, কম্পিউটার ও কমিউনিকেশন প্রযুক্তির জন্য ব্যবহৃত চিপ তৈরির অন্যতম মেটিরিয়াল।

বর্তমানে পুনর্নবীকরণযোগ্য শক্তির মধ্যে ফোটোভোল্টাইক প্রযুক্তি অন্যতম কার্যকর ও জনপ্রিয় মাধ্যম।

No comments:

Post a Comment

Featured post

২০২৫ সালে ভারতের পুনর্নবীকরণযোগ্য শক্তি: সৌর ও বায়ুশক্তিতে রেকর্ড উৎপাদন

২০২৫ সালে ভারতের রিনিউএবল এনার্জি সেক্টর আর শুধু “অলটারনেটিভ” নয়; এখন সেটা দেশের পাওয়ার সাপ্লাই সিস্টেম-এর অন্যতম অংশীদার। সোলার, উইন্ড, ব...

পপুলার পোস্ট