শব্দজব্দ বনাম দুষ্টু জব্দ: তিলু দাদুর চিঠি
ক্যুরিয়ারে চিঠিটি আজই পেলুম। কাকার সংগ্রহে পুরোনো 'আনন্দমেলা' থেকে ঠিকানাটা পেয়ে ঝাড়খণ্ডের গিরিডিতে ত্রিলোকেশ্বর শঙ্কু দাদুকে চিঠি লিখেছিলুম। এত তাড়াতাড়ি উত্তর পাব বলে অবশ্য আশা করিনি। চিঠিতে লিখেছেনঃ
প্রিয় ট্যাবলেট,
তোমার চিঠি পেয়েছি। আইডিয়াটা দুর্দান্ত। তবে সত্যি বলতে কি, আমি কখনো এভাবে ভাবিনি। এমনিতে শব্দজব্দ আমার খুবই প্রিয়, কিন্তু শব্দও যে দুষ্টুদের জব্দ করার কাজে লাগানো যায়, তা এক কথায় যুগান্তকারী আইডিয়া।
তোমার চিঠি পেয়ে, জার্মানির হামবোল্ট ইউনিভার্সিটির ন্যাচারাল সায়েন্স ফ্যাকাল্টিতে আমার পরিচিত এক গবেষককে ফোন করে তোমার আইডিয়াটা বলেছি। পরদিন, নিউরো সায়েন্সের এক প্রফেসরের সাথেও কথা হয়েছে। তিনি জানিয়েছেন, শব্দের কম্পাংককে যদি নিউরনের ন্যাচারাল কম্পাংকের সাথে সূত্রায়িত করা যায়, তাহলে মানুষের চিন্তাকে নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন নয়।
আমি ব্যাপারটা নিয়ে কয়েক দিন পড়াশোনা করি, তারপর কলকাতায় গিয়ে তোমার যন্ত্রটা দেখে আসব। ভালো থেকো। আশীর্বাদ নিও।
ইতি
তোমার তিলু দাদু।
(১)
আইডিয়াটা মাথায় প্রথম দানা বাঁধে গতবছর মামাবাড়িতে। দাঁত পড়ে যাবার পর, দিদিমা একটা পেতলের ছোট হামানদিস্তায় সুপুরি ভাঙে। একদিন টুং-টুং শব্দের রিদম শুনে আশ্চর্য হই। আমি দিদিমাকে ম্যানেজ করে হামানদিস্তাটা আনতে চেয়েছিলুম, কিন্তু মায়ের ‘না’ সব প্ল্যান মাটি করে দেয়।
‘শব্দ ব্রহ্ম’ কথাটা শুনেছি, কিন্তু ব্রহ্মের ব্যাপারটা আজগুবি মনে হলেও শব্দের প্রকারভেদ যে বেশ শক্তিশালী, তা মালুম হয়েছে। ভিন্ন মাত্রার ‘চুপ’ শব্দের ভিন্ন রিয়্যাকশন কারোর অজানা নয়।
(২)
আমার গবেষণাগারে একটি বাতিল পুরোনো ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক কলিংবেলের ভোল্টেজ বাড়িয়ে-কমিয়ে শব্দ নিয়ন্ত্রণের একটি যন্ত্র তৈরি করি। একদিন হঠাৎ এক অদ্ভুত এবং আশ্চর্য ঘটনা ঘটে।
আমাদের বেড়ালটি মাছ চুরি করে পালানোর সময় হঠাৎ আমার যন্ত্রটা চালু হয়। লক্ষ্য করি, বেড়ালটা ফিরে এসে মাছটি আবার ঠিক জায়গায় ফেরত রেখে চলে গেল।
পরের দিন দুপুরে রান্নাঘরে মাছ রেখে রি-এক্সপেরিমেন্ট করি। বাটিতে দুটি তোপসে মাছ রেখে দরজার ফাঁক দিয়ে আধঘণ্টা অপেক্ষার পর দেখলুম, বেড়ালটি এদিক-ওদিক তাকিয়ে সন্তর্পণে পা ফেলে এগিয়ে এসে যেইনা খপ করে মাছ মুখে পুরেছে, তক্ষুনি আমি যন্ত্রটি চালু করি।
রেজাল্ট হেরফের হয়নি। আমি অবশ্য ফেরত রাখা মাছ আর ফ্রিজে রাখিনি। পনেরো মিনিট পর লক্ষ্য করেছি, মাছ আর বাটিতে নেই। তখন অবশ্য আমার যন্ত্র স্লিপ-মোডে ছিল।
(৩)
দ্বিতীয় এক্সপেরিমেন্ট সফল কিনা জানি না। সকালে বারান্দায় দাঁড়িয়ে দেখছিলুম, সাদা জামা-প্যান্ট, গলায় মোটা সোনার চেন, পায়ে স্নিকার পরা এক জেঠু মিছিল নিয়ে এগিয়ে আসছেন। হঠাৎ কী মনে হলো! যন্ত্র চালু করলুম। কি আশ্চর্য! সেই জেঠু রিকশাওয়ালাকে বলল, “চল ফেরত দিয়ে আসি।”
তিন নম্বর ঘটনাটাও আশ্চর্যের। দাদুর মিষ্টি খাওয়া বারণ, তাই ঠাম্মা এক বয়াম নারকেল নাড়ু রান্নাঘরের কাবার্ডের মধ্যে লুকিয়ে রেখেছিল। একদিন বিকেলে যন্ত্রটি চালু করায় দেখলুম, দাদু কনফেস করছেন, “আর কক্ষনও না।”
আমি অবশ্য এত ডিটেইলে তিলু দাদুকে লিখিনি। কাকাকেও বিস্তারিত কিছু বলিনি। প্ল্যান আছে, কাকার লুকিয়ে সিগারেট খাওয়ার সময় যন্ত্রটা একবার চুপিচুপি চালু করব।
No comments:
Post a Comment