ভারতে সৌরশক্তির অভূতপূর্ব অগ্রগতি ও পশ্চিমবঙ্গের রুফটপ সোলার বিধি
ভারতে সৌরশক্তির অভূতপূর্ব বৃদ্ধি
২০১৪ সালে দেশের মোট সৌর-বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা ছিল প্রায় ৩ গিগাওয়াট (3 GW)। ২০২৫ সালের ৩০ নভেম্বর পর্যন্ত এই ক্ষমতা বেড়ে হয়েছে ১৩২.৮ গিগাওয়াট (132.8 GW)। নিশ্চিতভাবেই ভারত সৌরশক্তি ব্যবহারে এটি একটি বড় অর্জন।
বিভিন্ন ধরনের সৌর প্রকল্পের উৎপাদন ক্ষমতা
| প্রকল্পের ধরণ | উৎপাদন ক্ষমতা (GW) |
|---|---|
| ভূমির ওপর বসানো সোলার প্ল্যান্ট | ১০০.৮০ GW |
| গ্রিড সংযুক্ত রুফটপ সোলার | ২৩.১৬ GW |
| হাইব্রিড প্রকল্প (সৌর বিদ্যুৎ অংশ) | ৩.৩৪ GW |
| অফ-গ্রিড সোলার সিস্টেম | ৫.৫৫ GW |
বর্তমানে সৌর বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা দেশের অন্যান্য পুনর্নবীকরণযোগ্য শক্তি উৎসের উৎপাদন ক্ষমতাকে ছাড়িয়ে গেছে। নীতিআয়োগের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ভারতে জীবাশ্ম জ্বালানির বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা প্রায় ২৫৪ গিগাওয়াট এবং অন্যান্য পুনর্নবীকরণযোগ্য শক্তি মিলিয়ে মোট উৎপাদন ক্ষমতা ৫০৫.০২ গিগাওয়াট।
ভারতের বিদ্যুৎ উৎপাদনের উৎসভিত্তিক ক্ষমতা
| বিদ্যুৎ উৎপাদনের উৎস | উৎপাদন ক্ষমতা (GW) |
|---|---|
| সৌর বিদ্যুৎ (Solar PV) | ১২৯.৯২ GW |
| কয়লা (Coal) | ২২৪.৮৮ GW |
| জলবিদ্যুৎ (Hydro) | ৫০.৩৫ GW |
| বায়ু বিদ্যুৎ (Wind) | ৫৩.৬ GW |
| পারমাণবিক (Nuclear) | ৮.৭৮ GW |
| তেল ও গ্যাস (Oil and Gas) | ২০.৭২ GW |
| বায়ো-পাওয়ার (Bio-Power) | ১১.৬১ GW |
| ক্ষুদ্র জলবিদ্যুৎ (Small Hydro) | ৫.১৬ GW |
উল্লেখযোগ্য অর্জন: গ্লাসগো'র COP26-এ সাসটেইনেবল এনার্জি ফিউচার নিয়ে যে রোডম্যাপ ভারত ঘোষণা করেছিল, তার অন্যতম প্রতিশ্রুতি ছিল ২০৩০ সালের মধ্যে ৫০০ গিগাওয়াট পুনর্নবীকরণযোগ্য শক্তিচালিত বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা অর্জন করা। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, শুধু সৌরশক্তি নির্ভর বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা ধরলে, ভারত ইতিমধ্যেই এই লক্ষ্যমাত্রার পঞ্চাশ শতাংশ পূরণ করেছে।
কেন্দ্রীয় সরকারের বিশেষ প্রকল্প ও উদ্যোগ
১. পিএম সূর্য ঘর (PM Surya Ghar)
এই প্রকল্পটির মাধ্যমে ১ কোটি বাড়িতে সৌর বিদ্যুতের ব্যবস্থা সংস্থানের লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করা হয়েছে। এই স্কিমের অধীনে ভর্তুকি হিসেবে ₹ ১৩,৪৬৪.৬ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে।
সাবসিডি বিস্তারিত: ১ কিলোওয়াটের জন্য ₹৩০,০০০ এবং সর্বোচ্চ ৩ কিলোওয়াটের জন্য ₹৭৮,০০০ সাবসিডি প্রদান করা হয়। গ্রাহকরা অনলাইনে pmsuryaghar.gov.in পোর্টালে আবেদন করতে পারেন।
২. সোলার পার্ক প্রকল্প (Solar Park Scheme)
এই প্রকল্পের প্রাথমিক লক্ষ্য ছিল ২০ গিগাওয়াট, যা পরে বাড়িয়ে ৪০ গিগাওয়াট করা হয়েছে। ২০২৫ সালের ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত ১৩টি রাজ্যে মোট ৫৫টি সোলার পার্ক অনুমোদিত হয়েছে, যার সম্মিলিত ক্ষমতা ৩৯,৯৭৩ মেগাওয়াট (MW)। প্রকল্পটির সময়সীমা বাড়িয়ে ২০২৯ সালের ৩১ মার্চ পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়েছে।
৩. পিএম-কুসুম (PM-KUSUM)
এই প্রকল্পটি গ্রামীণ এলাকার চাষিদের জন্য। সৌরচালিত পাম্প স্থাপনের ক্ষেত্রে ভর্তুকি প্রদান করে কৃষকদের আয় বৃদ্ধি, কৃষিখাতে ডিজেলের ব্যবহার কমানো এবং পরিবেশ দূষণ হ্রাস করাই এই উদ্যোগের মূল উদ্দেশ্য।
পশ্চিমবঙ্গে বাড়ির ছাদে সৌর বিদ্যুৎ ব্যবস্থার রেগুলেশন
পশ্চিমবঙ্গ বিদ্যুৎ নিয়ন্ত্রক কমিশন ছাদে সৌর বিদ্যুৎ ব্যবস্থা সংস্থাপনের জন্য একটি রেগুলেশন প্রকাশ করেছে। আগের রেগুলেশনের থেকে বর্তমান রেগুলেশনটি বিদ্যুৎ ভোক্তাদের জন্য অনেকটাই আকর্ষণীয়। ২০২৫ সালের ৩১ জুলাই থেকে রেগুলেশনটি কার্যকর।
যোগ্য প্রোজিউমার (Consumer + Producer)
যে সব বিদ্যুৎ উপভোক্তার অনুমোদিত বিদ্যুৎ চাহিদা বা কনট্রাক্ট লোড ১ কিলোওয়াট বা বেশি তারাই নেট মিটারিং, নেট বিলিং বা গ্রস মিটারিং-এর যে কোনও একটি পদ্ধতিতে নিজেদের ছাদে সৌর বিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপন করতে পারবেন।
মিটারিং পদ্ধতিসমূহের মূল পার্থক্য
নেট মিটারিং
এই পদ্ধতিতে গ্রিড থেকে নেওয়া বিদ্যুৎ এবং গ্রিডে পাঠানো বিদ্যুতের ইউনিট বিয়োগ করে "নেট" ইউনিটের ভিত্তিতে বিল তৈরি হয়। উদ্বৃত্ত ইউনিট পরবর্তী বিলিং সাইকেলে জমা হয়। প্রতি আর্থিক বছরের শেষে (৩১শে মার্চ) জমে থাকা সমস্ত উদ্বৃত্ত ইউনিট শূন্য হয়ে যায়।
নেট বিলিং
এই পদ্ধতিতে বিদ্যুৎ সরবরাহকারী সংস্থা সৌরবিদ্যুৎ থেকে উত্পন্ন পুরো বিদ্যুৎ কিনে নেয় (ফিড-ইন ট্যারিফ প্রযোজ্য)। বিলিং সাইকেলে গ্রিড থেকে কেনা বিদ্যুতের মূল্য এবং গ্রিডে বিদ্যুৎ বিক্রির মূল্য যোগ-বিয়োগ করে নেট বিল নির্ধারিত হয়।
গ্রস মিটারিং
নেট বিলিং পদ্ধতির মতই, তবে আর্থিক বছরের শেষে প্রোজিউমারের পাওনা থাকলে ডিসকম তাকে টাকা পরিশোধ করে।
সৌর বিদ্যুৎ ব্যবস্থার ক্ষমতার সীমা
| মিটারিং পদ্ধতি | সৌর ব্যবস্থার ক্ষমতা |
|---|---|
| নেট মিটারিং | নুন্যতম ১ কিলোওয়াট থেকে সর্বোচ্চ ৫০০ কিলোওয়াট (চুক্তিবদ্ধ চাহিদার সীমার মধ্যে) |
| নেট বিলিং | ১ কিলোওয়াট থেকে চুক্তিবদ্ধ চাহিদা পর্যন্ত |
| গ্রস মিটারিং | ১ কিলোওয়াট থেকে চুক্তিবদ্ধ চাহিদা পর্যন্ত |
বিদ্যুৎ সরবরাহকারী সংস্থার লক্ষ্যমাত্রা (২০২৫–২৭)
| বিদ্যুৎ সরবরাহকারী সংস্থা | ২০২৫–২৬ লক্ষ্যমাত্রা | ২০২৬–২৭ লক্ষ্যমাত্রা |
|---|---|---|
| WBSEDCL | ১০০ মেগাওয়াট | ১৯৫ মেগাওয়াট |
| CESC Ltd. | ২৫ মেগাওয়াট | ৫০ মেগাওয়াট |
| IPCL | ২৫ মেগাওয়াট | ৫০ মেগাওয়াট |
| DVC | ৫ মেগাওয়াট | ৫ মেগাওয়াট |
গুরুত্বপূর্ণ তথ্য: আবেদন ফার্স্ট-কাম-ফার্স্ট-সার্ভ ভিত্তিতে বিবেচিত হবে। লক্ষ্যমাত্রা পূরণের পরের আবেদন পরবর্তী বছরের জন্য বিবেচিত হবে।
সারসংক্ষেপ
ভারতের সৌরশক্তি খাত দ্রুত উন্নতি করছে এবং পশ্চিমবঙ্গের নতুন বিধিগুলো গৃহস্থালি পর্যায়ে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনকে আরও সহজ ও আকর্ষণীয় করেছে। সরকারি ভর্তুকি, সহজ আবেদন প্রক্রিয়া এবং বিভিন্ন মিটারিং বিকল্পের মাধ্যমে সাধারণ মানুষ এখন সহজেই নিজের ছাদে সোলার প্যানেল বসিয়ে বিদ্যুৎ বিল কমানো এবং অতিরিক্ত বিদ্যুৎ বিক্রি করে আয় করার সুযোগ পাচ্ছেন।
কোন মিটারিং পদ্ধতি আপনার জন্য উপযুক্ত হবে, বা আপনার বাড়িতে কত ক্ষমতার সোলার সিস্টেম বসানো উচিত — এই বিষয়ে সুযোগ পেলে আলোচনা করা যাবে। কারও কোনও প্রশ্ন থাকলে কমেন্ট বক্সে জানাতে পারেন।
No comments:
Post a Comment