3 Dec 2025

হুদুড় দুর্গা: পাথুরে টাঁড় ও অরণ্যের অধিকার রক্ষার এক মহাকাব্যিক লড়াই

হুদুড় সোরেন: ভূমির অধিকার ও প্রতিরোধের উপাখ্যান

ঝাড়খণ্ড আর পশ্চিমবঙ্গের সীমান্তের গ্রাম আটনা। পলাশ, কুসুম, মহুয়া, অর্জুন আর শালের জঙ্গলের ধারে শুকনো, পাথুরে প্রান্তর-টাঁড়। টুকরো টুকরো পাথরের স্তূপ, ঝাঁটি আর খাঁ-খাঁ ঝাড়জঙ্গল। বর্ষায় একটি ফসল ওঠে, শীতের শেষ পর্যন্ত গরু-মোষ চড়ানোর ঘাস থাকে। বসন্তে শিমুল–পলাশ লাল রঙে চারপাশ রাঙায়, অথচ এখানকার মুন্ডা আর খারিয়াদের জীবন বর্ণহীন।

Sunset in Atna Village Purulia

চিত্রঃ আটনা গ্রামে সূর্যাস্ত

এই পাথুরে টাঁড়ে প্রতিদিন ঘুরে বেড়াত হুদুড় সোরেন, কাঁড়ার পিঠে চড়ে। তার চোখ শান্ত, নির্ভীক। পিতৃপুরুষের থেকে পাওয়া এই টাঁড়ই তার আশ্রয়, গর্ব এবং শিকড়। অর্জুন, হপন, সুকিলাল — হুদুড়ের বন্ধু এবং গ্রামবাসীরাও প্রতিদিন তার সঙ্গে থাকে টাঁড়ের পথে।

কিন্তু এক বসন্তে শহর থেকে আসে বাবুরা। ব্যাগ ভর্তি যন্ত্রপাতি, কাগজ-কলম। কানাঘুষো ছড়িয়ে পড়ে, এই মাটির নিচে আছে অভ্র। লুটেরাদের নজর জঙ্গলের এই টাঁড়ে। কর্পোরেট কোম্পানির সিইও নারায়নী ঘোষণা করে, “কিছু টাকা দিচ্ছি এই জায়গা ছেড়ে দাও, না হলে উচ্ছেদ করব।”

হুদুড় বুঝেছিল, এই টাঁড় চলে গেলে ভাত জুটবে না। সে দাঁড়ায় লাঠি হাতে। তার ডাকেই গ্রামবাসী জেগে ওঠে। মুন্ডা, খারিয়া, সাঁওতাল - সবাই নামে। লড়াই শুরু হয়। কাঁড়ার পিঠে হুদুড় সবার আগে, লাঠি উঁচিয়ে বলে, “এই জমি আমাদের, আমাদের সন্তানদের। হাজার বছর ধরে আমরা এর সঙ্গে বাঁধা।”

নারায়নীর নির্দেশে পুলিশ গুলি চালায়। হুদুড়ের বুক রক্তে ভিজে যায়। মাটিতে পড়ে গেলেও তার চোখে ভয় নেই। শুধু এক ঝলক আগুন অস্ফুটে বলে, “ভূমিপুত্রকে মেরে ফেলা যায়, কিন্তু ভূমির অধিকার মুছে ফেলা যায় না।”

হুদুড়ের মৃত্যুর পর রাতের আঁধারে জন্ম নেয় প্রতিজ্ঞা। হপন, সুকিলাল, অর্জুনরা শপথ নেয়, “হুদুড়ের রক্ত বৃথা যাবে না।” এক গভীর রাতে, ঝোপঝাড় জেগে ওঠে। দাউ দাউ করে জ্বলতে থাকে লুটেরাদের তাবু। নারায়নী পালায় আতঙ্কে। যদিও শহরের মিডিয়া নারায়নীকে ‘উন্নয়নের দূত’ বলে প্রচার করে, হুদুড়কে বলে ‘দুষ্কৃতী’, কিন্তু জঙ্গল অন্য কথা বলে।

পাথুরে জঙ্গলে, শালপাতার ভাতের ধোঁয়ার মধ্যে হুদুড়কে কেউ ভোলে না। মুন্ডাদের গানে, সাঁওতালদের ঢোলের তালায় হুদুড় সোরেন হয়ে ওঠে ‘হুদুড় দুর্গা’ - জঙ্গলের বীর। শিশুরা শোনে তার বীরত্বের গল্প। নারীরা গলায় হার মেলায় পলাশ ফুলের, বলে, “হুদুড়ের রক্তেই আমাদের বসন্ত রাঙা।”

হুদুড়ের নাম আজ প্রতিরোধের প্রতীক। টাঁড়ের প্রতিটি পাথরে লেখা হয়ে যায়, এই মাটি বিক্রি নয়, এই মাটি আমাদের।

No comments:

Post a Comment

Featured post

National Green Hydrogen Mission India: লক্ষ্য, প্রযুক্তি ও ভবিষ্যৎ

ভারতের National Green Hydrogen Mission কী, কেন এটি গুরুত্বপূর্ণ, এবং কীভাবে এটি ভারতকে একটি Global Green Hydrogen Hub বানাতে পারে - ...

পপুলার পোস্ট