10 Jan 2026

ব্ল্যাক হোল: মহাবিশ্বের রহস্যতম অঞ্চলের আদ্যোপান্ত

ব্ল্যাক হোল কী

ব্ল্যাক হোল বা কৃষ্ণগহ্বর হলো মহাবিশ্বের এমন একটি অঞ্চল যেখানে পদার্থের ঘনত্ব এত বেশি যে তার মহাকর্ষীয় টান থেকে আলো পর্যন্ত পালাতে পারে না। সহজ ভাষায় বলতে গেলে, এটি কোনো গর্ত নয় বরং অত্যন্ত ঘন একটি ভরকেন্দ্র।

ঘনত্ব কী এবং ব্ল্যাক হোলে কেন তা অসীমের কাছাকাছি

ঘনত্ব বলতে বোঝায় একক আয়তনে কতটা ভর রয়েছে। ব্ল্যাক হোলের ক্ষেত্রে আয়তন অত্যন্ত কম কিন্তু ভর বিপুল। ফলে ঘনত্ব ভয়াবহ মাত্রায় বেড়ে যায়।

একটি নক্ষত্র ধসে পড়লে তার ভর প্রায় একই থাকে কিন্তু আয়তন দ্রুত কমে যায়। এর ফলেই তৈরি হয় ব্ল্যাক হোলের চরম ঘনত্ব।

পরমাণুর ভেতরের ফাঁকা জগৎ এবং ব্ল্যাক হোল

পৃথিবীর সব পদার্থই পরমাণু দিয়ে তৈরি এবং পরমাণুর অধিকাংশ অংশই ফাঁকা। ব্ল্যাক হোল গঠনের সময় এই ফাঁকা স্থানগুলো ধীরে ধীরে সংকুচিত হয়ে যায়। পদার্থ গাদাগাদি হয়ে এক পর্যায়ে পৌঁছে যায় যেখানে বর্তমান পদার্থবিদ্যার নিয়ম ভেঙে পড়ে।

একটি বড় ফুটবল স্টেডিয়াম যদি একটি পরমাণুর সমান হয়, তাহলে সেই স্টেডিয়ামের মাঝখানে রাখা একটি মার্বেল গুলি হবে পরমাণুর কেন্দ্রীয় অংশ বা নিউক্লিয়াস। আর ইলেকট্রনগুলো স্টেডিয়ামের চারপাশে অনেক দূরে ঘুরে বেড়ায়।

অর্থাৎ, পদার্থ যত শক্তই মনে হোক না কেন, তার ভেতরটা আসলে ভয়ংকর রকমের ফাঁকা।

মহাকর্ষ কী — নিউটন বনাম আইনস্টাইন

মহাবিশ্বে যেকোনো দুটি বস্তুর মধ্যে একটি প্রাকৃতিক আকর্ষণ কাজ করে। এটিই মহাকর্ষ। নিউটনের মতে এটি একটি সরাসরি টান। আইনস্টাইনের ভাবনায় ভর স্পেস-টাইমকে বেঁকিয়ে দেয় এবং সেই বক্র পথ ধরে বস্তু চলাচল করে।

ব্ল্যাক হোল তৈরির সময় এই ফাঁকা জায়গাগুলোই সংকুচিত হয়ে যায় এবং স্পেস-টাইম বক্রতা চরম আকার নেয়।

কীভাবে একটি নক্ষত্র ব্ল্যাক হোলে পরিণত হয়

একটি ভারী নক্ষত্র তার জ্বালানি শেষ করলে আর নিজের মহাকর্ষকে ঠেকিয়ে রাখতে পারে না। তখন নক্ষত্রটি নিজের ভরেই ধসে পড়ে।

  • আয়তন কমে
  • ঘনত্ব বাড়ে
  • মহাকর্ষ অসীমের দিকে ধাবিত হয়

শেষ পর্যন্ত ব্ল্যাক হোল তৈরি হয়।

ইভেন্ট হরাইজন কী

ইভেন্ট হরাইজন হলো ব্ল্যাক হোলের চারপাশের সেই অদৃশ্য সীমানা, যার ভেতরে ঢুকলে কোনো কিছুই আর ফিরে আসতে পারে না — এমনকি আলোও নয়। এই কারণেই ব্ল্যাক হোলকে সরাসরি দেখা যায় না।

ব্ল্যাক হোল কীভাবে শনাক্ত করা হয়

ব্ল্যাক হোল নিজে অদৃশ্য হলেও তার আশপাশের নক্ষত্র, গ্যাস ও ধূলিকণার ওপর প্রবল মহাকর্ষীয় প্রভাব ফেলে।

এই বস্তুগুলো যখন ব্ল্যাক হোলের চারপাশে ঘুরতে থাকে, তখন উচ্চ শক্তির বিকিরণ তৈরি হয়। সেই বিকিরণ বিশ্লেষণ করেই বিজ্ঞানীরা ব্ল্যাক হোলের অস্তিত্ব নিশ্চিত করেন।

চন্দ্রশেখর সীমা এবং ব্ল্যাক হোলের জন্ম

চন্দ্রশেখর সীমা অনুযায়ী, কোনো নক্ষত্রের ভর যদি সূর্যের ভরের প্রায় ১.৪ গুণের বেশি হয় এবং তার জ্বালানি শেষ হয়ে যায়, তাহলে সে শেষ পর্যন্ত ব্ল্যাক হোলে পরিণত হতে পারে।

ব্ল্যাক হোলের প্রথম ছবি

২০১৯ সালে ইভেন্ট হরাইজন টেলিস্কোপ ব্যবহার করে বিজ্ঞানীরা প্রথমবারের মতো একটি ব্ল্যাক হোলের ছবি ধারণ করেন। এটি মেসিয়ার ৮৭ (M87) নামের একটি গ্যালাক্সির কেন্দ্রে অবস্থিত।

পৃথিবী থেকে প্রায় ৫.৫ কোটি আলোকবর্ষ দূরে অবস্থিত এই দানবীয় ব্ল্যাক হোলটির ভর সূর্যের চেয়ে প্রায় ৬৫০ কোটি গুণ বেশি।

আমাদের কাছের ব্ল্যাক হোল

আমাদের সবচেয়ে কাছের পরিচিত ব্ল্যাক হোল হলো Gaia BH1। এটি প্রায় ১৫৬০ আলোকবর্ষ দূরে অবস্থিত এবং এর ভর সূর্যের প্রায় ১০ গুণ।

শেষ কথা: বিজ্ঞান ও সমাজের রূপক

সমাজে আমরা যারা সবকিছু গিলে খায়, তাদের হাঙর বলি। কিন্তু যারা শুধু সম্পদ নয়, মানুষের সম্মান, অধিকার, এমনকি অস্তিত্ব পর্যন্ত গিলে খায় — তারা হাঙর নয়; তারা এক একটা আস্ত ব্ল্যাক হোল।

"মহাবিশ্বে মহাকাশে মহাকাল-মাঝে
আমি মানব একাকী ভ্রমি বিস্ময়ে, ভ্রমি বিস্ময়ে।
তুমি আছ, বিশ্বনাথ, অসীম রহস্যমাঝে
নীরবে একাকী আপন মহিমানিলয়ে।"

এই মহাবিশ্বে জীবনের উপস্থিতি কত ক্ষুদ্র!

ব্ল্যাক হোলের এই চরম ঘনত্ব বা সিংগুলারিটি সম্পর্কে আরও জানতে পড়ুন আমার ‘মহাবিস্ফোরণ বা বিগ ব্যাং’ পোস্টটি।

1 comment:

Featured post

২০২৫ সালে ভারতের পুনর্নবীকরণযোগ্য শক্তি: সৌর ও বায়ুশক্তিতে রেকর্ড উৎপাদন

২০২৫ সালে ভারতের রিনিউএবল এনার্জি সেক্টর আর শুধু “অলটারনেটিভ” নয়; এখন সেটা দেশের পাওয়ার সাপ্লাই সিস্টেম-এর অন্যতম অংশীদার। সোলার, উইন্ড, ব...

পপুলার পোস্ট