নাৎসি জার্মানি, ম্যাক্স বর্ন এবং কোয়ান্টাম বিপ্লব: যখন রাষ্ট্রনীতি বিজ্ঞানের শত্রু হয়
ভূমিকা
মুক্তচিন্তা ও জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চার ওপর যখন শাসকের নিয়ন্ত্রণ চেপে বসে, তখন শুধু সরকার নয়, ধ্বংস হয় একটি সভ্যতার বৌদ্ধিক মেরুদণ্ড। বিশ শতকের ত্রিশের দশকে নাৎসি জার্মানিতে ঠিক সেটাই ঘটেছিল। রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখলের পরে, অ্যাডলফ হিটলার এমন কিছু আইন চালু করেন, যার প্রভাব শুধু ইহুদি জনগোষ্ঠীর ওপর নয়, বরং সমগ্র আধুনিক বিজ্ঞানের গতিপথকে বাধাগ্রস্ত করে। ইতিহাসের এই দুঃসময়ের মধ্যেই জড়িয়ে আছে কোয়ান্টাম মেকানিক্সের অন্যতম স্থপতি ম্যাক্স বর্নের (Max Born) জীবন ও সংগ্রামের গল্প।
এনাবেলিং আইন: গণতন্ত্রের কফিনে শেষ পেরেক
১৯৩৩ সালে ক্ষমতায় এসেই হিটলার এনাবেলিং আইন (Enabling Act) পাশ করান। এই আইনের মাধ্যমে জার্মান আইনসভাকে কার্যত পাশ কাটিয়ে নাৎসি মন্ত্রীসভা, বিশেষত চ্যান্সেলরের হাতে নতুন আইন প্রণয়নের সম্পূর্ণ ক্ষমতা চলে যায়। আশ্চর্যজনকভাবে, আইনি পথেই জার্মানির গণতান্ত্রিক কাঠামো ভেঙে পড়ে। এই আইন লাগু হওয়ার কয়েকদিনের মধ্যেই নাৎসি সরকার শুরু করে এক ভয়ংকর শুদ্ধিকরণ অভিযান।
আর্য রক্তের নামে রাষ্ট্রীয় শুদ্ধিকরণ
'পেশাদার সিভিল সার্ভিস আইন'-এর মাধ্যমে জার্মান প্রশাসনে ‘বিশুদ্ধ আর্য রক্ত’ নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়। এর ফলাফল ছিল ভয়াবহ:
- নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর সরকারি কর্মীদের গণ-ছাঁটাই।
- ইহুদি ও অ-আর্য সরকারি কর্মচারীদের বাধ্যতামূলক অবসর।
- বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান থেকে বিজ্ঞানী ও ছাত্রদের বহিষ্কার।
গটিঞ্জেন বিশ্ববিদ্যালয়: একটি স্বর্ণযুগের পতন
জার্মানির গটিঞ্জেন বিশ্ববিদ্যালয় ছিল গণিত ও পদার্থবিজ্ঞানের বিশ্বখ্যাত পীঠস্থান। কিন্তু নাৎসি নীতির ধাক্কায় এখান থেকেই একে একে বিদায় নিতে বাধ্য হন শ্রেষ্ঠ মেধাবীরা। ১৯৩৩ সালের এক সন্ধ্যায়, নাৎসি শিক্ষামন্ত্রী ডেভিড হিলবার্টকে প্রশ্ন করেছিলেন, “গটিঞ্জেনে গণিত কি এবার ইহুদিদের প্রভাব থেকে মুক্ত?” হিলবার্টের সংক্ষিপ্ত উত্তর ছিল ইতিহাসের এক নির্মম ব্যঙ্গ: “গটিঞ্জেনে এখন আর কোনো গণিতই নেই।”
এই বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই ম্যাক্স বর্নসহ অন্তত নয়জন প্রখ্যাত বিজ্ঞানী দেশ ছাড়তে বাধ্য হন।
ম্যাক্স বর্ন ও কোয়ান্টাম মেকানিক্সের জন্ম
ম্যাক্স বর্ন ১৯২৫ সালে ওয়ার্নার হাইজেনবার্গের সঙ্গে যৌথভাবে ম্যাট্রিক্স মেকানিক্স প্রণয়ন করেন। এটি ছিল কোয়ান্টাম কণার অবস্থান ও গতি ব্যাখ্যার এক বিপ্লবী পদ্ধতি। পরের বছর আরউইন শ্রোয়েডিঙ্গারের তরঙ্গ সমীকরণ থেকে কণার সম্ভাব্য ঘনত্ব (Probability Density) নির্ণয়ের ব্যাখ্যা দেন বর্ন। এই ব্যাখ্যাই কোয়ান্টাম মেকানিক্সে 'সম্ভাব্যতা'কে মৌলিক ভিত্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে। ১৯৫৪ সালে তিনি পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার পান।
আইনস্টাইন বনাম কোয়ান্টাম অনিশ্চয়তা
কোয়ান্টাম তত্ত্বের সম্ভাব্যতানির্ভর ব্যাখ্যা আলবার্ট আইনস্টাইনের কাছে গ্রহণযোগ্য ছিল না। তাঁর বিখ্যাত উক্তি, “ঈশ্বর পাশা খেলেন না” (God does not play dice), ম্যাক্স বর্নকে লেখা একটি চিঠির অংশ। তবে হাইজেনবার্গ ও বর্নের নোবেল পুরস্কারের জন্য আইনস্টাইন নিজেই সুপারিশ করেছিলেন।
নির্বাসন এবং ভারতের সেই অসমাপ্ত অধ্যায়
নাৎসি নিপীড়নের ফলে ম্যাক্স বর্ন জার্মানি ছাড়তে বাধ্য হন এবং কেমব্রিজে আশ্রয় নেন। ১৯৩৫ সালে নোবেলজয়ী বিজ্ঞানী সি ভি রমন তাঁকে ব্যাঙ্গালোরের ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ সায়েন্স (IISc)-এ আনার উদ্যোগ নেন। ৭ নভেম্বর তিনি সেখানে 'রহস্যময় সংখ্যা ১৩৭' নিয়ে বক্তৃতা দেন। প্রশাসনিক অসহযোগিতার কারণে ভারতে থাকা সম্ভব হয়নি। এডিনবরা বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে অধ্যাপনার সুযোগ দেয়।
শেষ জীবন ও উত্তরাধিকার
অবসর গ্রহণের পর ম্যাক্স বর্ন আবার জার্মানিতে ফিরে যান। ১৯৭০ সালের ৫ জানুয়ারি গটিঞ্জেনে তাঁর মৃত্যু হয়। তিনি শুধু কোয়ান্টাম মেকানিক্সের স্থপতিই নন, তিনি ছিলেন এক প্রজন্মের বিজ্ঞানীদের বিবেক। রাষ্ট্র বিজ্ঞানীকে তাড়াতে পারে, কিন্তু জ্ঞানকে মুছে ফেলতে পারে না — সেটাই প্রমাণ করেছেন তিনি।
শেষকথা: ইতিহাসের শিক্ষা
নাৎসি জার্মানি প্রমাণ করেছিল, বর্ণবাদী রাজনীতি একটি জাতির জ্ঞানভাণ্ডারকে কত দ্রুত শূন্য করে দিতে পারে। গটিঞ্জেনের পতন এবং ম্যাক্স বর্নের নির্বাসন আজ এক ঐতিহাসিক সতর্কবার্তা। যখন বিজ্ঞান ও মেধার ওপর রাজনৈতিক সংকীর্ণতা চেপে বসে, সভ্যতাই পিছিয়ে যায়।
পড়ুন: মার্ক্সের গণিত: দর্শন ও ক্যালকুলাসের এক নতুন দ্বান্দ্বিক দৃষ্টি।
Good
ReplyDelete