সাম্রাজ্যবাদ, পুঁজিবাদের সংকট ও ভেনিজুয়েলা: কেন এই আগ্রাসন বিচ্ছিন্ন নয়
ভূমিকা
সাম্রাজ্যবাদ হলো একটি শক্তিশালী দেশ বা জাতির অন্য দুর্বল দেশ বা অঞ্চলের উপর রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক আধিপত্য বিস্তারের নীতি। এই আধিপত্য বিস্তারের কাজটি করা হয় অর্থনৈতিক, কূটনৈতিক বা সামরিক প্রভাব খাটিয়ে। সাম্রাজ্যবাদের মূল লক্ষ্যই সম্পদ ও বাজারের দখল বা নিয়ন্ত্রণ এবং নিজেকে আরও শক্তিশালী করে তোলা। ভেনিজুয়েলায় মার্কিন আগ্রাসন তার সর্বশেষ উদাহরণ মাত্র।
সাম্রাজ্যবাদ কী এবং কেন এটি পুঁজিবাদের চূড়ান্ত রূপ
সাম্রাজ্যবাদ বলতে বোঝায় একটি শক্তিশালী রাষ্ট্রের দ্বারা অন্য দুর্বল রাষ্ট্রের উপর রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক আধিপত্য প্রতিষ্ঠার প্রক্রিয়া। সাম্রাজ্যবাদ যেভাবে কাজ করে:
- অর্থনৈতিক চাপ ও ঋণের ফাঁদ
- কূটনৈতিক হস্তক্ষেপ
- প্রয়োজনে সরাসরি সামরিক আগ্রাসন
লেনিনের বিশ্লেষণে স্পষ্ট যে, সাম্রাজ্যবাদ হলো পুঁজিবাদের সর্বোচ্চ ও সংকটপূর্ণ স্তর। মুনাফার স্বাভাবিক পথ সংকুচিত হলে দখল ও লুটই হয়ে ওঠে শেষ ভরসা।
সভ্যতার ভাষা, ভেতরে দখলদারির রাজনীতি
সাম্রাজ্যবাদ নিজেকে মানবাধিকার, গণতন্ত্র ও সভ্যতার রক্ষকর্তা হিসেবে তুলে ধরে। কিন্তু এই ভাষার আড়ালে থাকে সম্পদ দখল ও ভূ-রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণের নীতি। ভেনিজুয়েলায় “অস্ত্র”, “মাদক” বা “গণতন্ত্র রক্ষা” আসলে রাজনৈতিক আড়াল। দেশটি খনিজ ও জ্বালানি সম্পদে সমৃদ্ধ এবং স্বাধীন অর্থনৈতিক নীতি অনুসরণ করছে, যা সাম্রাজ্যবাদের জন্য অগ্রহণযোগ্য।
আমেরিকার সংকট: এটি কেবল ঋণের হিসাব নয়
- যুক্তরাষ্ট্র ইতিহাসের সর্বোচ্চ ঋণের বোঝা বহন করছে।
- গড়ে প্রতিটি নাগরিকের মাথাপিছু ঋণ ১ লক্ষ ২৫ হাজার ডলারের বেশি।
- মোট ঋণ ভারতের প্রায় ৬–৭ বছরের বাজেটের সমান।
- সুদের বোঝা রাষ্ট্রীয় সংকটে পরিণত হয়েছে।
একমেরু বিশ্বের অবসান ও বহুমেরু বাস্তবতা
সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যাওয়ার পর বিশ্ব দীর্ঘদিন একমেরু ছিল। আজ সেই বাস্তবতা বদলেছে। বর্তমান বৈশ্বিক পরিবর্তনগুলো হলো:
- চীনের প্রযুক্তি ও শিল্পে উত্থান।
- বিশ্ববাজারে একচেটিয়া আধিপত্যের অবসান।
- ট্যারিফ যুদ্ধের মাধ্যমে মার্কিন বাজার রক্ষার চেষ্টা।
ডলারের একাধিপত্যে ফাটল
ডলার দীর্ঘদিন বৈশ্বিক অর্থনীতির কেন্দ্রবিন্দু ছিল। কিন্তু চীন, রাশিয়া, ভারত, ব্রাজিল ও দক্ষিণ আফ্রিকা বিকল্প পেমেন্ট ব্যবস্থা ও নিজস্ব মুদ্রায় বাণিজ্যের পথে এগোচ্ছে। এই পরিবর্তন সাম্রাজ্যবাদী ব্যবস্থার জন্য গভীর উদ্বেগের কারণ।
ভেনিজুয়েলা একা নয়
ভেনিজুয়েলা, ইরাক, লিবিয়া, ইরানে আমেরিকার সামরিক আগ্রাসন কোনো বিচ্ছিন্ন যুদ্ধ নয়। এগুলো হলো আমেরিকার নিজস্ব পুঁজিবাদী সংকট ঢাকার ধারাবাহিক সাম্রাজ্যবাদী পদক্ষেপ।
বামপন্থী অবস্থান ও আন্তর্জাতিক সংহতি
বামপন্থীরা ঐতিহাসিকভাবেই সাম্রাজ্যবাদের বিরোধী। এই ধারাবাহিকতায় ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্ক্সবাদী) ভেনিজুয়েলায় মার্কিন আগ্রাসনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ মিছিল করেছে।
উপসংহার
সাম্রাজ্যবাদ যতই ভাষা ও মুখোশ বদলাক, তার মৌলিক চরিত্র বদলায় না। ভেনিজুয়েলা সেই বৃহত্তর পুঁজিবাদী সংকটেরই প্রকাশ।
No comments:
Post a Comment