3 Dec 2025

কাল্পনিক সংখ্যা: পঁচিশ টাকার আলু থেকে কোয়ান্টাম মেকানিক্সের রহস্য

কাল্পনিক সংখ্যা বা Imaginary Number কী? গণিতের এক অদ্ভুত জাদুর দুনিয়া

পঁচিশ টাকা আলুর কেজি। তিন কেজি কিনে একশো টাকা দিলে ফেরত পাবেন পঁচিশ টাকা। এই সাধারণ হিসাবের জন্য আমাদের খুব একটা অঙ্ক জানার দরকার হয় না। কিন্তু অঙ্কের নাম শুনলেই অনেকের জ্বর আসে। আমারও আসতো! তবে আজ এমন এক সংখ্যার কথা বলবো যা আপনার ভাবনার জগতকে বদলে দেবে।

একটি অদ্ভুত প্রশ্ন ও গণিতবিদদের মাথাব্যথা

এবার একটি প্রশ্ন করা যাক - কোন সংখ্যাকে সেই সংখ্যার সঙ্গে গুণ করে $1$ যোগ করলে যোগফল $0$ হয়? বন্ধুরা ভাববে, “উফফ! আবার অঙ্ক!” কিন্তু মজার বিষয় হলো, আজ থেকে প্রায় চারশো বছর আগে এই সমীকরণ সমাধান করতে গিয়ে বড় বড় গণিতবিদরাও হিমশিম খাচ্ছিলেন।

গাণিতিক ভাষায় সমস্যাটি ছিল এমন:

$$x^2 + 1 = 0$$

অর্থাৎ, এমন একটি সংখ্যা $x$ খুঁজে বের করতে হবে যার বর্গ হবে $-1$ ($x^2 = -1$)।

বাস্তব সংখ্যার সীমাবদ্ধতা

আমরা জানি, বাস্তব সংখ্যা (Real Number) মানে হলো সেই সব সংখ্যা যা আমরা কল্পনা করতে পারি—যেমন ধনাত্মক, ঋণাত্মক, ভগ্নাংশ কিংবা দশমিক। কিন্তু বাস্তব জগতের নিয়ম হলো, কোনো সংখ্যাকে সেই সংখ্যা দিয়ে গুণ করলে (বর্গ করলে) তা কখনোই ঋণাত্মক হতে পারে না।

$$(+1) \times (+1) = 1$$

$$(-1) \times (-1) = 1$$

তাহলে এমন কোন সংখ্যা আছে যার বর্গ হবে $-1$? বাস্তব জগতে এমন কোনো সংখ্যার অস্তিত্ব নেই!

কাল্পনিক সংখ্যার জন্ম (Imaginary Number)

ষোড়শ শতাব্দীতে ইতালীয় গণিতবিদ রাফায়েল বম্বেলি (Rafael Bombelli) এক সাহসী সমাধান দিলেন। তিনি বললেন, “কেন নয়? আমরা এমন একটি সংখ্যা কল্পনা করতেই পারি যার মান হবে মাইনাস একের বর্গমূল ($\sqrt{-1}$)।”

যেহেতু আমাদের বাস্তব সংখ্যার জগতে এর কোনো দেখা মেলে না, তাই এর নাম দেওয়া হলো কাল্পনিক সংখ্যা বা Imaginary Number। গণিতে একে ইংরেজির ছোট হাতের $i$ (আই) দিয়ে প্রকাশ করা হয়।

$$i = \sqrt{-1}$$

কাল্পনিক সংখ্যার ম্যাজিক

সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হলো, দুটি কাল্পনিক সংখ্যা গুণ করলে একটি বাস্তব সংখ্যা ($-1$) পাওয়া যায়। যেমন:

$$i \times i = -1$$

আবার একে চারবার গুণ করলে পাওয়া যায় বাস্তব ধনাত্মক সংখ্যা ($1$)। এটি যেন বিজ্ঞানের এক অনন্য ম্যাজিক!

ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং ও বিজ্ঞানে এর ব্যবহার

আপনি কি জানেন? ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং-এ কারেন্ট (Current)-কে '$I$' দিয়ে প্রকাশ করা হয়। তাই সেখানে গণ্ডগোল এড়াতে কাল্পনিক সংখ্যাকে '$i$'-এর বদলে ইংরেজিতে $j$ (জে) দিয়ে লেখা হয়।

আজকের আধুনিক সভ্যতা এই ইমাজিনারি নাম্বার ছাড়া অচল। এর প্রয়োগ রয়েছে:

  • কোয়ান্টাম মেকানিক্স: পরমাণুর ভেতরের রহস্য বুঝতে
  • বৈদ্যুতিক সার্কিট: জটিল এসি (AC) কারেন্টের হিসাব মেলাতে
  • কম্পিউটার সিগন্যাল প্রসেসিং: ভিডিও বা অডিওর মান উন্নত করতে
  • কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI): আধুনিক ডেটা সায়েন্সের জটিল হিসাবে

উপসংহার

অঙ্ক কেবল খাতা-কলমের হিসাব নয়, বরং কল্পনা আর বাস্তবের সেতুবন্ধন। চারশো বছর আগের সেই "মাথা চুলকানো" সমস্যাটিই আজ আমাদের আধুনিক প্রযুক্তির ভিত্তি।

গ্রাভিটি বিষয়ে পড়ুন - ছুটিরদিনে গ্রাভিটি

No comments:

Post a Comment

Featured post

২০২৫ সালে ভারতের পুনর্নবীকরণযোগ্য শক্তি: সৌর ও বায়ুশক্তিতে রেকর্ড উৎপাদন

২০২৫ সালে ভারতের রিনিউএবল এনার্জি সেক্টর আর শুধু “অলটারনেটিভ” নয়; এখন সেটা দেশের পাওয়ার সাপ্লাই সিস্টেম-এর অন্যতম অংশীদার। সোলার, উইন্ড, ব...

পপুলার পোস্ট